পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনীতিতে হঠাৎ ঐক্যের সুর!

॥ আনন্দ সাংকৃত্যায়ন ॥

উক্তি ১ঃ “মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা’র মৃত্যুবার্ষিকীর এই মহান দিনে সকল পক্ষকে আহ্বান করছি নিজেদের মধ্যে ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত ও হানাহানি বন্ধ করুন”

উক্তি ২ঃ “এমএন লারমার দিয়ে যাওয়া নির্দেশনা অনুসারে রাজনীতিতে জুম্ম জাতির স্বার্থ সংরক্ষণ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত ভুলে শান্তির পথে হাঁটতে  সকলকে আন্তরিক হতে হবে”

উক্তি ৩ঃ “ইউপিডিএফ অতীতের সংঘাতের সকল তিক্ত অভিজ্ঞতার বোঝা পেছনে ঝেড়ে ফেলে মহান নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ‘ক্ষমা করা ভুলে যাওয়া’ নীতির ভিত্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে ঐক্যের এক নতুন অধ্যায়ের সুচনা করতে প্রস্তুত  রয়েছে”

প্রথম উক্তিটি জনসংহতি সমিতির(মূল দল) সহসভাপতি ও সাবেক সাংসদ ঊষাতন তালুকদারের দ্বিতীয়টি জনসংহতি সমিতির (এম এন লারমা) সাধারণ সম্পাদক তাতিন্দ্র লাল চাকমার এবং সর্বশেষ উক্তিটি ইউপিডিএফের। ৩টি দলই যে ঐক্যে একমত তা উক্তিগুলোতেই স্পষ্ট প্রতীয়মান। কেন হঠাত এই পরিবর্তন? কথায় আর কাজে মিল থাকবে তো? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পাহাড় সফরের প্রতিক্রিয়া নয় তো? পার্বত্য চট্টগ্রামে র‍্যাব আগমনে সন্ত্রস্ত্র হয়ে জোটবদ্ধ হচ্ছে দলগুলো? এমন হাজারো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে পাহাড়বাসীর মনে এবং কোনটিই অবান্তর নয়!

ভাতৃঘাতি সংঘাত আঞ্চলিক রাজনীতির ইতিহাসের সাথে মিশে আছে। শান্তি চুক্তি পরবর্তী সময়ে জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি বা পিসিজেএসএস নামে দল গঠন করে আঞ্চলিক রাজনৈতিক  কর্মকান্ড শুরু করে। অপরদিকে  চুক্তির বিভিন্ন ধারার বিরোধীতা করে ১৯৯৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রামে আত্মপ্রকাশ ঘটে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট বা ইউপিডিএফ’র। মতার্দশের অমিলে আবারো ২০০৭ সালে ভাঙ্গন ধরে  পিসিজেএসএস’এ। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে প্রথম নির্বাচিত সাংসদ মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার আর্দশপন্থী আত্মসমর্পণকারী পিসিজেএসএস নেতারা বিভক্ত হয়ে পিসিজেএসএস-এমএন লারমা নামে দল গঠন করে রাজনৈতিক কার্যক্রম শুরু করে। ভাঙ্গন থামাতে পারেনি ইউপিডিএফও। ২০১৭ সালের  ১৫ নভেম্বর তপন জ্যোতি বর্মার নেতৃত্বে ইউপিডিএফের একটি দল বেরিয়ে এসে গঠন করে ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক। এনিয়ে চুক্তির পক্ষ বিপক্ষের  চারটি সংগঠন দাঁড়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামে। ২০১৬ সাল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর মধ্যে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত বন্ধ থাকলেও ২০১৮ সালের ৩ ও ৪ মে রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেএসএস এমএন লারমার কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি শক্তিমান চাকমা এবং ইউপিডিএফ(গণতান্ত্রিক) এর সভাপতি  তপন জ্যোতি চাকমা ওরফে বর্মাসহ ৬ জন খুন হওয়ার মধ্য দিয়ে ভাতৃসংঘাতের আগুন নতুনভাবে জ্বলে ওঠে। এরপর থেকে লাগাতারভাবে পাহাড়ে একের পর এক টার্গেট কিলিং চলতে থাকে। সর্বশেষ চলতি বছরের ১৮ মার্চ উপজেলা নির্বাচনের দায়িত্বপালন শেষে  নির্বাচনী সরঞ্জাম নিয়ে ফেরার পথে বাঘাইছড়ির ৯ কিলোমিটার এলাকায় গাড়িবহরে সন্ত্রাসীদের এলোপাথাড়ি ব্রাশফায়ারে প্রিজাইডিং অফিসার ও আনসার সদস্যসহ ৭ জন নিহত হয়। পরদিন ১৯ মার্চ বিলাইছড়ি উপজেলার আওয়ামীলীগ নেতা সুরেশ তঞ্চগ্যাকে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা নতুনভাবে উত্তপ্ত করে তোলে পাহাড়ের পরিবেশ। অন্যদিকে পাহাড়ের ৩ জেলার মধ্যে তুলনামূলকভাবে কম সংঘাতময় জেলা বান্দরবানেও একের পর এক আওয়ামীলীগ নেতার গুম খুনে নড়েচড়ে বসে সরকার।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের বিশেষ উদ্যোগে পাহাড়ে আসেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ২দিনের বিশেষ আইনশৃঙ্খলা সভায় পাহাড়ের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত হওয়ার পর আঞ্চলিক দলগুলোর প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারিসহ পাহাড়কে শান্ত করার জন্য সবরকমের পদক্ষেপ নিবেন বলে আশ্বাস প্রদান করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। তারই ফলাফল হিসেবে ৬৭৭ জনের চৌকস জনবল নিয়ে পাহাড়ে র‍্যাবের নতুন ব্যাটেলিয়ন গড়ার ঘোষণা আসে। এই ঘোষণাতেই টনক নড়ে আঞ্চলিকদলগুলোর। নানাভাবে এই ঘোষণার বিরোধিতা করাসহ নতুন স্ট্র্যাটেজী সাজাতে থাকে সবকটি দল। সেই স্ট্র্যাটেজীর অংশ হিসেবে ইতিমধ্যেই বহুবছর ধরে চলে আসা ভাতৃঘাতী নীতি থেকে বেরিয়ে এসে ঐক্যের ইঙ্গিতও দেওয়া শুরু করে দিয়েছে আঞ্চলিকদলগুলো।

আপাতদৃষ্টিতে ভাতৃঘাতী সংঘাত বন্ধ ও ঐক্যের ডাক পাহাড়বাসীর জন্য সুখবর কিন্তু! একটি কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। এই কিন্তুর বহু কারণ রয়েছে। প্রথমত, এই ধরণের ঐক্যের ডাক অতীতেও বহুবার দেওয়া হয়েছে কিন্তু কথায় ও কাজে ফারাক ছিল যথেষ্ঠ। দ্বিতীয়ত, ভাতৃঘাতী সংঘাত বন্ধের ইঙ্গিত দেওয়া হলেও ব্যাপক হারে চাঁদাবাজি ও অস্ত্রবাজী বন্ধের বিষয়ে কোন মন্তব্য করেনি দলগুলো উল্টো সমতলের চাঁদাবাজির সাথে পাহাড়ের চাঁদাবাজির তুলনা করে সম্পূর্ণ বিষয়টিকেই জায়েজ করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। তৃতীয়ত, দলগুলো অতীতের সব দ্বন্দ ভুলে এক হওয়ার কথা বললেও মূলত র‍্যাবের মত এলিট ফোর্সকে মোকাবেলা করার জন্যই এই উদ্যোগ বলে অনেকেই মনে করছেন।

পাহাড়ের মানুষরা সেই আদিকাল থেকেই সহজ-সরল গোছের। রাজনীতির জটিল সমীকরণ তাদের মাথায় ঢুকে না ঢুকানোর চেষ্টাও করে না তারা। জুম্মদের অধিকার আদায়ের কথা বলে পার্বত্য চট্টগ্রামে বর্তমানে ৪টি দল গড়ে উঠলেও আদতে কোন দলই এখন সাধারন মানুষের অধিকারের পক্ষে লড়াই করছে না, এর পরিবর্তে খেটে খাওয়া জুম্ম পরিবারদের রক্ত পানি করা শ্রমের আয় থেকে চাঁদাবাজি করে শুধুমাত্র নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য ভারী ভারী অস্ত্র কিনে সংঘাতে লিপ্ত হচ্ছে দলগুলো। এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে চায় তারা। মুক্তি চায় পাহাড়। যদি ঐক্য মুক্তি দিতে পারে তাহলে “জয়তু ঐক্য”