আঞ্চলিকদলগুলোর সশস্ত্র তৎপরতায় পাহাড়ে বেড়েছে খুন:২১মাসে রাঙামাটিতে ৬৭ জনকে হত্যা

॥ আলমগীর মানিক ॥

পাহাড়ে কিছুতেই থামছে না আঞ্চলিক দলীয় স্বশস্ত্র ক্যাডারদের আধিপত্য বিস্তারের লড়াই ও টার্গেট কিলিং মিশন। এক একটি এলাকায় এক একটি আঞ্চলিক সংগঠন তাদের আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার নেশায় একের পর এক হত্যা, অপহরণ ও গুমের মিশন পরিচালনা করছে। চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে অস্ত্রবাজির এই মহড়ায় সবুজ পাহাড়ে চলছে রক্তের হোলি খেলা। দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে সশস্ত্র তৎপরতা; দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে খুনের তালিকা। গত ২১ মাসে শুধুমাত্র রাঙামাটিতেই আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে খুনের শিকার হয়েছে অন্তত ৬৭ জন।

গত বছরের তুলনা এবছর হত্যার ঘটনা প্রায় দেড়গুন বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৮ সালে রাঙামাটিতে খুনের শিকার হয় ২৮জন। চলতি বছরের নভেম্বরের ১৮ তারিখে সর্বশেষ খুন হওয়া তিনজনসহ এ পর্যন্ত হত্যার শিকার হয়েছে সর্বমোট ৩৯জন। তার মধ্যে জানুয়ারী-২, ফেব্রুয়ারী-৪, মার্চ-১০, এপ্রিল-৭ (?) মে-২, জুন-১, জুলাই-২, আগষ্ট-৪, সেপ্টেম্বর-২, অক্টোবর-২, নভেম্বর-৩ জনসহ সর্বমোট ৩৯জনকে হত্যা করা হয়েছে।

পাহাড়ে আঞ্চলিক দলগুলোর রক্তের হোলি খেলা বন্ধে এতোদিন অনেকটাই কচ্ছপগতিতে আইনের প্রয়োগ চললেও সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সন্ত্রাসীদের ব্যাপারে ধারাবাহিক পদক্ষেপ নিতে বেশ অগ্রসর হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাঙামাটির পুলিশ সুপার মোঃ আলমগীর কবীর পিপিএম। তিনি জানান, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এসব সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারে ধারাবাহিকত অভিযান অব্যাহত রেখেছে পুলিশসহ আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। কিন্তু সন্ত্রাসীরা গহীন অরন্যে গিয়ে গা ঢাকা দেওয়ায় সন্ত্রাসীদের অবস্থান নিশ্চিত করে সেখানে অভিযান চালানো সম্ভব হয়না। বিগত প্রায় দেড় বছর রাঙামাটিতে কাজ করার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে এসপি আলমগীর কবীর বলেন, প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের যথেষ্ট অভাব থাকায় পুলিশের পক্ষ থেকে সঠিকভাবে অভিযান পরিচালনা করা কষ্টসাধ্য হচ্ছে। আমাদের আধুনিকায়নের কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে। উপকরন সংযোজিত হলে আমরা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে দ্রুততম সময়ের মধ্যেই কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সক্ষম হবো।

প্রশাসনিক দায়িত্বশীল সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, চলতি বছর ২০১৯ সালের শুরুতেই জানুয়ারীর ৪ তারিখে বাঘাইছড়ির বাবু পাড়ায় ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করা হয় বসু চাকমাকে। বাঘাইছড়ি থানার মামলা নং-০২, তারিখ-০৫/০১/২০১৯ইং। ২৯শে জানুয়ারী লংগদুতে পবিত্র কুমার চাকমাকে হত্যা করা হয়। লংগদু থানার মামলা নং-০৬,তারিখ-৩০/০১/১৯ইং।

ফেব্রুয়ারীর ০৩ তারিখে চন্দ্রঘোনার পূর্ব কোদালায় হত্যা করা হয় মিতালী মারমাকে। চন্দ্রঘোনা থানার মামলা নং-০১, তারিখঃ-০৩/০২/১৯। ০৪ তারিখে চন্দ্রঘোনার ভাল্লুকিয়ায় গুলি করে মোঃ জাহেদ (২৫) ও মংসুইনু মারমা (৪০)কে হত্যা করা হয়। চন্দ্রঘোনা থানার মামলা নং-০২, তারিখঃ-০৫/০২/১৯। একইদিনে রাঙামাটি সদরের বালুখালী ইউপিস্থ ২নং ওয়ার্ডের মধ্যপাড়া গ্রামস্থ কাপ্তাই হ্রদ থেকে তাকে ভোতা অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা অজ্ঞাত ব্যক্তির লাশ পাওয়া যায়। কোতয়ালী থানার মামলা নং-০৭, তারিখ-০৪/০২/১৯।

মার্চের ০৭ তারিখে বাঘাইছড়ির বঙ্গলতলী বি-ব্লকে উদয় বিকাশ চাকমা ওরফে চিক্কোধন চাকমা (৩৮) কে গুলি করে হত্যা করা হয়। বাঘাইছড়ি থানার মামলা নং-০২, তারিখ:২২/০৪/২০১৯। ১৮ই মার্চে নির্বাচন শেষে ফেরাপথে বাঘাইছড়ির নয়কিলোতে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের অতর্কিত ব্রাশ ফায়ারে মোঃ আমির হোসেন (৩৭); মোঃ আলা আমিন (১৭); মিহির কান্তি দত্ত (৪০); জাহানারা বেগম (৪০); বিলকিস আক্তার (৪০); মন্টু চাকমা (২৫) ও আবু তৈয়বসহ মোট ৮জনকে হত্যা করা হয়। বাঘাইছড়ি থানার মামলা নং-০২, তারিখ-২০/০৩/২০১৯। মার্চের ১৯ তারিখে বিলাইছড়িতে আ:লীগের জনপ্রিয় নেতা সুরেশ কান্তি তঞ্চঙ্গ্যাকে গুলি করে হত্যা। বিলাইছড়ি থানার মামলা নং-০১, তারিখ-২৩/০৩/২০১৯।

এপ্রিলের ৩ তারিখে রাজস্থলীর পোয়াইতু পাড়ায় মায়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের মধ্যে গোলাগুলিতে ৭ জন নিহতের খবর পাওয়া গেলেও প্রশাসন বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। তবে স্থানীয় একাধিক সূত্র থেকে সেদিন গোলাগুলির খবরটি জানা গেছিলো।

মে মাসের ৮ তারিখে রাঙামাটির বরকল উপজেলায় হত্যার শিকার হয় আপ্রুসে মারমা (৩২)। ১৯শে মে চন্দ্রঘোনায় আ:লীগের নেতা ক্যহলাচিং মারমা (৪৭) কে গুলি করে হত্যা করা হয়। চন্দ্রঘোনা থানার মামলা নং-০১, তারিখঃ ২০/০৫/১৯ইং।

জুন মাসের ২৭ তারিখে শুভলংয়ে সৃতিময় চাকমা ওরফে কোকো (৩২)কে গুলি করে হত্যা করা হয়। বরকল থানার মামলা নং-০৪, তারিখ-২৯/০৬/২০১৯।

জুলাইয়ের ১ তারিখে চন্দ্রঘোনায় মা ¤্রাসাং খই মারমা (৬০) ও মেয়ে মে সাংনু মারমা(২৯)কে নিজ বাসার ভেতরে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। চন্দ্রঘোনা থানার মামলা নং-১, তারিখ-০৩/০৭/২০১৯।

১১ই আগষ্ট ২০১৯ইং তারিখে বাঘাইছড়িতে এ্যানো চাকমা এবং তার সহযোগী স্বতঃসিদ্ধি চাকমাকে গুলি করে হত্যা করে। বাঘাইছড়ি থানার মামলা নং-০২, তারিখ-১৪/০৮/২০১৯। ১৮আগষ্ট ২০১৯ইং তারিখে রাজস্থলীর পোয়াতু পাড়ায় সেনাবাহিনীর সৈনিক মোঃ নাসিমকে গুলি করে হত্যা করা হয়। রাজস্থলী থানার মামলা নং-০২, তারিখ-২৬/০৮/২০১৯। ২৩ আগষ্ট তারিখে বাঘাইছড়ির সাজেকে কসাই সুমন ওরফে লাকির বাপ (৪৫) কে গুলি করে হত্যা করা হয়। সাজেক থানার মামলা নং-০৪, তারিখ-২৩/০৮/২০১৯খ্রিঃ।

সেপ্টেম্বর মাসের ১৭ তারিখ বাঘাইছড়িতে হত্যা করা হয় রিপেল চাকমা (২৫) ও বর্ষণ চাকমা (২৪)নামে দুইজনকে। অক্টোবর মাসের ৯ তারিখ ভোররাতে সন্ত্রাসীদের গুলিতে বাঙ্গালহালিয়ার কাকড়াছড়ি সুইচ গেট এলাকায় অংসুইঅং মারমা (৪৫) নিহত হয়।

২৩শে অক্টোবর রাজস্থলী উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি হেডম্যান দ্বীপময় তালুকদারকে গুলি করে হত্যা। সর্বশেষ চলতি মাসের গত ১৮ই নভেম্বর ২০১৯ইং সোমবার সন্ধ্যারাতে গাইন্দ্যা ইউনিয়নের বালুমুড়া মারমা পাড়া এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয় তিনজনকে। রাজস্থলী থানায় দায়েরকৃত মামলা নাম্বার-১। তারিখ: ২০/১১/২০১৯ইং।

এদিকে, বিগত ২০১৮ সালে রাঙামাটি জেলায় হত্যার শিকার হয়েছে ২৮জন। রাঙামাটির পুলিশ বিভাগ, বিভিন্ন সংস্থা ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে বিগত ২০১৮ সালের মার্চে-৩, এপ্রিলে-৬, মে-৯, জুন-২, জুলাই-১, আগষ্ট-২, সেপ্টেম্বর-২, অক্টোবর-৩ জনসহ ১ বছরে শুধু রাঙামাটিতেই আধিপত্যের লড়াইয়ে নির্মম হত্যার শিকার হয়েছে ২৮ জন।

প্রাপ্ত তথ্যানুসারে ২০১৮ সালের মার্চ মাসের ০৩ তারিখে বাঘাইছড়ির বঙ্গলতলীতে নতুন মনি চাকমাকে খুন করে স্বজাতীয় সন্ত্রাসীরা। বাঘাইছড়ি থানার মামলা নং-০২, তারিখ-১১/০৩/২০১৮। মার্চের ১৫ তারিখে লংগদু’র ৭নং লংগদু ইউপিস্থ দজরপাড়া বাজারে নিরীহ রঞ্জন চাকমা ওরফে জঙ্গলি চাকমা (২৭)কে হত্যা করা হয়। লংগদু থানার মামলা নং-০১,তারিখ-১৮/০৬/১৮। মার্চের ৫ তারিখ সোমবার রাজস্থলীর তাইতংয়ের চুশাক পাড়ায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে হত্যা। এলাকার জঙ্গল থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়।

এপ্রিলের ১১ তারিখে নানিয়ারচরের সাবেক্ষ্যংয়ের হেডম্যান পাড়ায় জনি ওরফে সুনীল তঞ্চঙ্গ্যাকে হত্যা করা হয়। নানিয়ারচর থানার মামলা নং-০১,তারিখ-১২/০৪/২০১৮ইং। ১২ই এপ্রিল নানিয়ারচরে প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হয় সাধন চাকমা ও কালোময় চাকমা। নানিয়ারচর থানার মামলা নং-০৫, তারিখ-২৬/০৪/২০১৮ইং। একই দিনে ক্যাঙ্গালছড়ি ব্রীজের দক্ষিন পার্শ্বে অজ্ঞাতনামা পাহাড়ি সন্ত্রাসীর গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়। নানিয়ারচর থানার মামলা নং-০২, তারিখ-১২/০৪/২০১৮। ১৫ই এপ্রিল বাঘাইছড়িস্থ মারিশ্যা আটকিলো রাবার বাগানে বিজয় চাকমা(৩২)কে গুলি করে হত্যা। ২০ এপ্রিল কাপ্তাইয়ের রেশমবাগানে মোঃ ইব্রাহিম খলিল (২৭)কে গলা কেটে হত্যা।

মে মাসের ০৩ তারিখে নানিয়ারচরে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এ্যাড: শক্তিমান চাকমাকে। এই ঘটনায় নানিয়ারচর থানার মামলা নং-০২, তারিখ-০৮/০৫/২০১৮। ৪ই মে’ নানিয়ারচরের বেতছড়িতে গনতান্ত্রিক ইউপিডিএফ’র প্রধান তপন জ্যোতি বর্মাসহ তার সাথে থাকা তনয় চাকমা (৩১), সুজন চাকমা (৩০), সেতু লাল চাকমা, (৩৬) ও বাঙালি মাইক্রোবাস চালক মো. সজীবকে (৩৫)নির্মমভাবে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে। নানিয়ারচর থানার মামলা নং-০৩, তারিখ-০৮/০৫/২০১৮। ২৮শে মে সাজেকে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করা হয়, অটল চাকমা(৩০), স্মৃতি চাকমা(৫০) ও সঞ্জিব চাকমা(৩০)কে। সাজেক থানার মামলা নং-০১, তারিখ-০২/০৬/২০১৮।

১৭ই জুন বাঘাইছড়ির রূপকারীতে সুরেন বিকাশ ওরফে ডাক্তার বাবুকে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। বাঘাইছড়ি থানার মামলা নং-০৪, তারিখ-১৮/০৬/২০১৮। ১৮ই জুন চন্দ্রঘোনার নারানগিরী মূখ এলাকায় আমেসে মার্মা(৪৫) নামক একজনকে হত্যা করা হয়। চন্দ্রঘোনা থানার মামলা নং-০১, তারিখ-১০/০১/২০১৮।

জুলাইয়ের ২৬ তািরখে বাঘাইছড়ির বঙ্গলতলীতে বন কুসুম চাকমাকে খুন করা হয়। বাঘাইছড়ি থানার মামলা নং-০১, তারিখ-২৯/০৭/২০১৮।

আগষ্টের ১৮ তারিখে চন্দ্রঘোনার আমতলীঢালা এলাকায় উথোয়াইচিং মার্মা(৫০)কে হত্যা করা হয়। চন্দ্রঘোনা থানার মামলা নং-০২, তারিখ-২৭/০৩/২০১৮। আগষ্টের ২৪ তারিখে বাঘাইছড়ির বঙ্গলতলীতে খুন হয় মিশন চাকমা। বাঘাইছড়ি থানার মামলা নং-০৩,তারিখ-২৪/০৮/২০১৮।

সেপ্টেম্বরের ২০ তারিখে নানিয়ারচরের রামসুপারি পাড়ায় যোদ্ধ মোহন চাকমা ওরফে আর্কষণ চাকমা (৪২) ও শ্যামল কান্তি চাকমা(৩৫)কে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই ঘটনায় নানিয়ারচর থানার মামলা নং-০২, তাং-২৪/০৯/১৮।

অক্টোবর মাসের ০৩ তারিখে বাঘাইছড়ির তুলাবানে কল্পনা চাকমা ও বিন্দা চাকমাকে খুন করা হয়। বাঘাইছড়ি থানার মামলা নং-০১, তারিখ-০৬/১০/২০১৮। ১৭ই অক্টোবর নানিয়ারচরের বিহার পাড়ায় খুন হয় শান্ত চাকমা। নানিয়ারচর থানার মামলা নং-০১, তারিখ: ২০/১০/১৮।

রাঙামাটির সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলেছেন, আঞ্চলিকদলগুলোর ব্যাপক সশস্ত্র তৎপরতা বন্ধে এ যাবৎ পাহাড়ের প্রথাগত নেতৃবৃন্দ কোনো উদ্যোগ নেয়নি। পান থেকে চুন খসলেই এখানকার স্থানীয় নেতারা যেভাবে রাস্তায় নেমে যায়, পার্বত্য চুক্তির পরবর্তী সময়থেকে আজ পর্যন্ত পাহাড়ের সশস্ত্র তৎপরতা বন্ধে একটি উদ্যোগও গ্রহণ করেনি অত্রাঞ্চলের প্রথাগত নেতৃবৃন্দরা। মুলতঃ পাহাড়ে সশস্ত্র তৎপরতায় স্থানীয় প্রথাগত নেতৃবৃন্দের মৌন সমর্থন থাকার বিষয়টি ইতিমধ্যেই প্রতিয়মান হয়েছে বিভিন্ন গোয়েন্দা রিপোর্টে।