শান্তিচুক্তির ২২ বছরেও পাহাড়ের আকাশে উড়েনি শান্তির পায়রা: নিহত ১৫ শতাধিক

॥ আলমগীর মানিক ॥

অবৈধ অস্ত্রের ব্যাপক ব্যবহারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তারসহ সশস্ত্র তৎপরতার মাধ্যমে জনজীবন অতিষ্ট্য করে তোলায় দীর্ঘ ২২টি বছরেও পাহাড়ের আকাশে নেই শান্তির পায়রার আনাগোনা। পার্বত্য শান্তিচুক্তির ২২ বছর পরও তিন পার্বত্য জেলায় কাঙ্খিত শান্তি ফিরে আসেইনি; বরং অব্যাহত সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও জাতিগত বিদ্বেষের কারণে পার্বত্য জনপদে সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছে। শান্তিচুক্তির অধিকাংশ ধারা বাস্তবায়ন হলেও ভূমি জরিপসহ কয়েকটি ইস্যুতে সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পার্বত্য জেলাগুলোতে বিদ্যমান সশস্ত্র গ্রুপগুলোর আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও পারস্পরিক দ্বন্ধের কারণে পাহাড়ের পরিবেশ দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। নিজেদের স্বার্থের দ্বন্ধে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরকারী জনসংহতি সমিতি ভেঙে এখন চার টুকরা। এই চার সংগঠনের প্রভাবিত এলাকায় সাধারণ মানুষ নিষ্পেষিত জীবন-যাপন করছে।

সরকারি-বেসরকারি ও গণমাধ্যমের সূত্রমতে, পার্বত্য অঞ্চলে বিগত ২২ বছরে সশস্ত্র সংঘাতে নিহতের সংখ্যা অন্তত ১৫ শতাধিকের মতো। আহত হয়েছে প্রায় এক হাজারের মতো। অপহরণের শিকার হয়েছে ৪ শতাধিকেরও অধিক। বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে ৫ শতাধিকেরও বেশি। সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের কারণে গ্রেফতার হয়েছে প্রায় এক হাজারের অধিক। সাম্প্রতিক বছরগুলোর গত ২১ মাসে শুধুমাত্র রাঙামাটিতেই আধিপত্যের লড়াইয়ে খুনের শিকার হয়েছে অন্তত ৬৮ জন। গত ২০১৮ সালে রাঙামাটিতে খুনের শিকার হয়েছে ২৮জন। চলতি বছরের নভেম্বরের ১৮ তারিখে খুন হওয়া তিনজন ও সর্বশেষ পহেলা ডিসেম্বর রাঙামাটির বড়াদমে নিহত হওয়া জেএসএস কালেক্টর বিক্রমসহ অদ্যবদি পর্যন্ত হত্যার শিকার হয়েছে সর্বমোট ৪০জন। গত বছরের তুলনা এবছর হত্যার ঘটনা প্রায় দেড়গুন বৃদ্ধি পেয়েছে। সর্বশেষ পহেলা ডিসেম্বর রাঙামাটির বড়াদমে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে জেএসএস এর চীফ কালেক্টর বিক্রম ওরফে সুমন চাকমাকে। রোববার দুপুরে তার লাশ উদ্ধার করে রাঙামাটি কোতয়ালী থানা পুলিশ।

বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর পার্বত্য এলাকার সমস্যা সমাধানে আলোচনা শুরু করে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর পার্বত্য সশস্ত্র সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সঙ্গে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষর করে। এ চুক্তি অনুযায়ী ১৯৯৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি খাগড়াছড়ির স্টেডিয়ামে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শান্তিবাহিনীর ৭৩৯ সদস্যের প্রথম দলটি সন্তু লারমার নেতৃত্বে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে অস্ত্রসমর্পণ করে। আত্মসর্মপণের দিনই পাহাড়িদের একটি অংশ চুক্তির বিরোধিতা করে অনুষ্ঠানস্থলে চুক্তিবিরোধী প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করে। এরপর চুক্তির বিরোধিতা করে প্রসীত খিসার নেতৃত্বে জন্ম নেয় ইউপিডিএফ। চুক্তির কয়েক বছর যেতে না যেতেই চুক্তির পক্ষের জনসংহতি সমিতি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একইভাবে ইউপিডিএফও দুইভাবে বিভক্ত হয়। এরপর থেকে ৪ ভাগের পাহাড়ি সংগঠনের মধ্যে শুরু হয় ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত।

পার্বত্য বিশেষজ্ঞদের মতে, পক্ষগুলোর মধ্যে সংঘাত যতটা না আদর্শিক কারণে, তারচেয়ে বেশি এলাকার দখলদারিত্ব, দখল নিয়ন্ত্রণে রাখা, চাঁদাবাজির পয়েন্টগুলো নিয়ন্ত্রণ, বিশাল সশস্ত্র গ্রুপের কর্মীদের ভরণপোষণের ব্যয়ভার আদায়, প্রতিপক্ষের কর্মসূচিতে বাধা প্রদান-পাল্টা প্রতিরোধ এসবই তিনটি রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে বিরোধের কারণ।

অবশ্য পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বিক এই সশস্ত্র সন্ত্রাদের দায়িত্ব নিচ্ছেনা কেউই। এখনো পর্যন্ত দোষারোপের রাজনীতিতেই চলছে পাহাড়ের নেতাদের দৈনন্দিন বক্তব্যের মহড়া। দীর্ঘ ২২টি বছরেও থামছেনা পাহাড়ের সশস্ত্র তৎপরতা। কেনই বা এখনো পর্যন্ত চলছে অবৈধ অস্ত্রের মহড়া। এসব বিষয়টি জানতে চাইলে এখনো পর্যন্ত পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারের সংশ্লিষ্ট্যদের আন্তরিকতার অভাব রয়েছে অভিযোগ করে আসছে চুক্তি সম্পাদনকারি সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএস।

অপরদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সংসদ সদস্য বীর বাহাদুর বলেছেন, দীর্ঘ দুই যুগেরও অধিক সময়কালধরে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, হানাহানি, অশান্তিময় একটা অবস্থা ছিলো, সেই পরিবেশকে নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ১৯৯৭ সালে শান্তি, উন্নয়ন ও সম্প্রীতির জায়গায় নিয়ে এসেছেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। মন্ত্রী বলেন, ইতিমধ্যেই পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিচুক্তির অধিকাংশ ধারা বাস্তবায়ন করেছে সরকার। বাকি গুরুত্বপূর্ন ধারাগুলো বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে চলেছে। সেগুলোও বাস্তবায়ন হয়ে গেলে পাহাড়ে উন্নয়নের স্রোত আরো বেশি করে প্রবাহিত হবে এবং সম্প্রীতির বন্ধন আরো সুদৃঢ় হবে বলেও জানিয়েছেন পার্বত্য মন্ত্রী বীর বাহাদুর।

এদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেএসএস এর সভাপতি সন্তু লারমা বলেছেন, পার্বত্য চুক্তির বাস্তবায়ন না হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিরাজমান সমস্যার সমাধান হবে না। জনাব লারমা বলেছেন, ২২টি বছর অতিবাহিত হয়ে গেলেও অদ্যবদি মৌলিক বিষয়গুলোর সমস্যা সমাধান হয়নি।

অপরদিকে, পাহাড়ে শান্তিচুক্তির পক্ষের নিরীহ মানুষদের খুন, অপহরণ করে যে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে তাতে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্থ হচ্ছে বলে মনে করেন রাঙামাটির সংসদ সদস্য দীপংকর তালুকদার। শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া মন্তব্য করে সংসদ সদস্য দীপংকর তালুকদার বলেন, আজকে অংযত বক্তব্য, নৈরাজ্যমূলক আচরণ, অস্ত্রের ভাষায় কথা বলা, শান্তিচুক্তির পক্ষের শক্তিকে দূর্বল করা, গুলি করে হত্যা করাসহ বিগত দিনে যারাই ইউপিডিএফকে নিষিদ্ধ করতে চিৎকার করেছিলো, তারাই আজকে ইউপিডিএফ এর সাথে হাত মিলিয়েছে। এসব করতে থাকলে চুক্তি বাস্তবায়নের পথ আদৌ কি মশৃন থাকে? দীপংকর তালুকদার বলেন, আমরা অত্যন্ত দুঃখের সাথে লক্ষ্য করছি শান্তিচুক্তির বিরোধীতাকারি বিএনপির সাথে আঁতাত করে চলেছে চুক্তিরই পক্ষের একটি শক্তি। পার্বত্য শান্তিচুক্তির পূর্নাঙ্গ বাস্তবায়নে চুক্তির পক্ষে এবং চুক্তি মানে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে;অন্যথায় বিলম্বের পথ দীর্ঘতরই হতে থাকবে।

এদিকে, ১৯৯৭ সালে যে ভাবে, যে পরিস্থিতিতে পার্বত্য শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে ঠিক সেভাবেই চুক্তি পুর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হলে সংকট নিরসন সম্ভব বলে মনে করেন চাকমা রাজা ব্যারিষ্টার দেবাশীষ রায়। তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই পারবেন পাহাড়ের বর্তমান সমস্যার সমাধান করতে। পাহাড়ের বাসিন্দারা যে ভাবে চায় সেভাবেই পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন করতে হবে।

পার্বত্য চুক্তির সময় বিরোধীতার করলেও পরবর্তীতে ক্ষমতায় এসে চুক্তি বাতিল করেনি এবং ভবিষ্যতে ক্ষমতায় আসলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিবে বলে জানিয়েছেন, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা দীপেন দেওয়ান।

অপরদিকে বাঙ্গালী কমিউনিটির নেতৃবৃন্দ মনে করছেন পার্বত্য শান্তিচুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ে বসবাসরত বাঙ্গালীদের অধিকার সম্পূর্নরূপে খর্ব করা হয়েছে। শান্তিচুক্তির মাধ্যমে পার্বত্যাঞ্চলের বাঙ্গালীদের কোনো লাভ হয়নি এবং এই চুক্তি পার্বত্য বাঙ্গালীদের সকল অধিকার কেড়ে নিয়েছে মন্তব্য করে বাঙ্গালী কমিউনিটির নেতা এ্যাডভোকেট আবছার আলী বলেছেন পার্বত্য শান্তিচুক্তির পর সরকার কর্তৃক গঠিত পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের মাধ্যমেও পাহাড়ের সকল বাঙ্গালীদেরকে ভূমির অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।

পাহাড়ে বর্তমান বিরাজমান পরিস্থিতির আলোকে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন যে, চুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ের সাধারণ মানুষ যে শান্তির আশা করেছিল মানুষের সে আশা পুরোপুরি পুরণ হয়নি। পার্বত্য শান্তিচুক্তির ২২ বছর পার হলেও পার্বত্য অঞ্চলে চলছে এখনো অস্ত্রের ঝনঝনানি, অপহরণ ও চাঁদাবাজি। ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে পার্বত্য অঞ্চলে প্রাণ হারাচ্ছে নিরীহ-অসহায় মানুষ।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, পার্বত্য জেলাগুলো থেকে সেনা প্রত্যাহার করা হলে নিরাপত্তা শূন্যতা তৈরি হবে। তাদের মতে এমনিতেই পাহাড়ে বর্তমানে সুষ্ঠু পরিস্থিতি নেই। এখনো চাষাবাদ, পণ্য পরিবহনসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই সশস্ত্র গ্রুপগুলোকে চাঁদা দিতে হয়। কাঙ্খিত চাঁদা না পেলে তারা খুন, অপহরণসহ নানা অপকর্মে লিপ্ত হয়। সুতরাং সঙ্গত কারণে স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তার স্বার্থেই সেখানে সেনা সদস্যদের উপস্থিতি প্রয়োজন। নিরাপত্তা বাহিনীর এক উদ্বর্তন কর্মকর্তার মতে চুক্তি শর্ত অনুযায়ী পার্বত্য জেলার দূর্গম অঞ্চল থেকে বেশকিছু সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে। স্থানীয় জনগণের স্বার্থেই সব ক্যাম্প প্রত্যাহার করা মোটেও উচিত হবে না।

বেসামরিক জনগণের নিরাপত্তার জন্যই সেখানে সেনাক্যাম্প রাখা প্রয়োজন। সব সেনা সরিয়ে নিলে পার্বত্য জেলায় নিরাপত্তাশূন্যতা তৈরি হবে। সরকারী বিভিন্ন মহলের মতে, শান্তিচুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি বাস্তবায়ন করেছে বাকিগুলোও বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াধীন। সরকারের পক্ষ থেকে মাত্র একটিই শর্ত ছিল সশস্ত্র পাহাড়ি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো অস্ত্র সমর্পন করবে। কিন্তু পাহাড়ি নেতাদের রাজনৈতিক ছত্রছায়ার কারণে শান্তি চুক্তির ২২ বছরেও সেটা সম্ভব হয়নি। তাই পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সেনাক্যাম্প বৃদ্ধির মাধ্যমে আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজে বের করার উপর গুরুত্বারোপ করেছেন পাহাড়ের বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ।