ফেরিওয়ালা কাশেমের যাযাবর জীবন

॥ সৌরভ দে ॥

“ফেরিওয়ালার জীবনডা ভালা না খারাপ তা কইতে পারমু না তবে মাঝে মইদ্ধ্যে পরিবারের লাইগা মন কান্দে। বাসায় দুইডা বাইচ্চা আছে আমার, ওদের লাইগাই বেশি খারাপ লাগে” ফেরিওয়ালা জীবনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলছিল কাশেম। পুরো নাম জিজ্ঞেস করলে বলল মোঃ কাশেম, বয়স ৩০ এর কাছাকাছি তবে সঠিক হিসেব নেই। কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরবের মানুষ সে। গত ৮ বছর ধরে ফেরি করে দেশের বিভিন্ন শহরে ডালিম, পেয়ারা বিক্রি করছে কাশেম। ইতিমধ্যেই ১৬টি জেলা ঘুরে ফেলেছে সে।

তার ডালিম আকারে ছোট হলেও গুণগত মানে বেশ ভাল অন্য দোকানের চেয়ে দামেও সস্তা। ডালিম কিনতে এসে তার ব্যবহার ভাল লাগায় বড় ভাই আলমগীর মানিক তার ব্যাক্তিগত জীবন সম্পর্কে জানতে চাইলে খানিকটা সংকোচিত হয়ে সে বলতে থাকে তার যাযাবর জীবনের গল্প। আলাপের এক পর্যায়ে জানা যায় ফেরিওয়ালার পাশাপাশি সে একজন কৃষকও। বৈশাখ মাস তার কৃষি কাজেই চলে যায়, জৈষ্ঠ্যে সে ফেরি করতে বের হয়। চাষবাস করলে আর ফেরি করার কি দরকার এমন প্রশ্নের জবাবে সে বলল, “চাষবাস কইরা তো পেট চালাইতে পারি না। বাসায় মেলা মানুষজন, সবার খরচ আমারি দেওন লাগে। হুদাই চাষবাসের উপর থাকলে না খাইয়া থাওন লাগবো”। বছরের ৯টা মাস দেশের বিভিন্ন জায়গায় তার ফেরি করেই কেটে যায়, বাকি ৩টা মাস সে পরিবারের সাথে থাকে। তার দুটি ছেলে সন্তানও আছে। সে নিজে পড়ালেখা না করলেও ছেলেদের ঠিকই পড়ালেখা করাচ্ছে এবং এই সে ব্যাপারে বেশ কঠোর। সে চায় তার সন্তান শিক্ষিত হয়ে বড় হয়ে চাকরি-বাকরি করুক।

রাঙ্গামাটিতে সে আছে ৪ মাস ধরে। চট্টগ্রামের আড়ত থেকে ফল কিনে এনে এইখানে ফেরি করে বিক্রি করছে সেসহ আরো ৪ জন। তারা সবাই একসাথেই একটি বাসা ভাড়া নিয়ে থাকে। বাসা ভাড়া বাদ দিয়ে তার কাছে আরো ১৫-২০ হাজার টাকা লাভ থাকে যা সে বাড়িতে পাঠায়। দেশের ১৬টি জেলা ঘুরলেও তার সবচেয়ে বেশি ভাল লেগেছে টেকনাফ তবে তার দৃষ্টিতে সবচেয়ে খারাপ জায়গা মহেশখালী। পাহাড়ের কোন জেলা তার বেশি পছন্দ হয়েছে প্রশ্ন করলে সে উত্তর দিলো “বান্দরবান”। তার মতে বান্দরবানের মানুষ রাঙ্গামাটির মানুষের চেয়ে বেশি সৌখিন। দরদামও খুব একটা করে না!

আলাপচারিতায় এই পর্যায়ে সে একটু খোলামেলা হল, নিজে থেকেই বলতে লাগলো তার অভিজ্ঞতা। এমন সময় তার নজরে পড়লো আমি তার ছবি তুলছি, সাথে সাথে অপ্রস্তুত অবস্থা হতে নিজেকে হালকা গুছিয়ে নিয়ে ছবির জন্য পোজ দিলো কাশেম। এই লেখা বা লেখায় ব্যবহৃত তার ছবি কোনটিই হয়ত তার চোখে পড়বে না। কাশেম কি কখনো জানতে পারবে যে তার যাযাবর জীবন নিয়েও লেখালেখি হয়?