রাঙামাটিতে বুদ্ধিজীবি দিবসের আলোচনায় অধিকাংশ সরকারী কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতিতে বক্তাদের ক্ষোভ

॥ আলমগীর মানিক ॥

বাঙ্গালী জাতীয় জীবনে অনেকগুলো শোকাবহ দিনের মধ্যে অন্যতম শোকাবহ দিন শহীদ বুদ্ধিজীবি দিবসটি ভাবগাম্বীর্য্যরে মধ্যদিয়ে পালনের লক্ষ্যে সারাদেশেই সরকারী ছুটির দিন ঘোষণা করে সরকার। তারই ধারাবাহিকতায় যথাযোগ্য মর্যাদায় জাতির সূর্য সন্তানদের স্মরণে রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। যথারীতি সময়নুসারে শনিবার সকাল সাড়ে দশটা থেকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় প্রাঙ্গনে নির্মিত শহীদ আব্দুল আলী মঞ্চে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হলেও উক্ত অনুষ্ঠানে রাঙামাটির সরকারী ও আধা সরকারী অফিসগুলোর এক তৃতীয়াংশ কর্ণধার বা তাদের প্রতিনিধিদের কেউই অংশগ্রহণ করেনি। বিষয়টি নিয়ে আলোচকদের প্রায় সবাই ক্ষোভ প্রকাশ করে বক্তব্য রেখেছেন।

জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় বুদ্ধিজীবি হত্যা দিবসের গুরুত্ব তুলে ধরে বক্তব্য দানকালে রাঙামাটির পুলিশ সুপার আলমগীর কবির-পিপিএম বলেছেন, আজকে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে সংঘটিত হয়েছিল বাঙ্গালী জাতীর সবচাইতে বর্বরোচিত একটি অধ্যায়। যার প্রধান ভূমিকায় ছিল পাক বাহিনী এবং তাদের সাথে যারা অংশগ্রহণ করেছিল এদেশীয় কিছু কুলাঙ্গার সেই রাজাকার, আলবদর, আল সামস বাহিনী।

বক্তব্যের এক পর্যায়ে বুদ্ধিজীবিদের স্মরণে আয়োজিত আলোচনা সভায় রাঙামাটির অনেকগুলো সরকারী প্রতিষ্ঠানের কোনো প্রতিনিধির উপস্থিতি না থাকার বিষয়টি তুলে ধরে পুলিশ সুপার আলমগীর কবির-পিপিএম বলেন, আজকে এই অনুষ্ঠানে আমরা যারা উপস্থিত হয়েছি, সেই সংখ্যাটা আসলেই নগন্য। এটাকে কি বলবো…এটা কি কর্মব্যস্ততা, নাকি উদাসীনতা, নাকি অবহেলা, কোন দিকটিকে আমরা আখ্যায়িত করবো? যাদের জন্য পেয়েছি বিজয়, পেয়েছি স্বাধীনতা, এই দেশ পেয়েছি, তাদের জন্য মাত্র আধা ঘন্টা-একঘন্টা সময় আমরা খরছ করতে চাইনা, অথচ টেলিভিশন, ফেসবুকে আমরা ঘন্টার পর ঘন্টা দিনের পর দিন সময় ব্যয় করে চলেছি।

একটু আত্ম জিজ্ঞাসার প্রয়োজন রয়েছে মন্তব্য করে আলমগীর কবির বলেন, আমরা মঞ্চের চেয়ারে বসে বসে ডিসি সাহেব, কর্ণেল জিএস ও আমি আলাপ করছিলাম, এই রাঙামাটিতে অনেকগুলো ডিপার্টমেন্ট আছে, আমরা সেসকল অফিসগুলোর প্রধানকে চাইনি, একজন প্রতিনিধি থাকলেতো তারা এই বিষয়গুলো অন্তত নিজেদের পরিবারের সদস্যদেরকে হলেও জানাতে পারতো। এই ক্ষেত্রে তাদের পরিবারের নতুন প্রজন্মের লোকজন সঠিক ইতিহাসটি অন্তত জানতে পারতো। এই ম্যাসেজের মাধ্যমে অন্তত পরিবারের সদস্যরা হলেও জানতে পারতো যে আজকে শহীদ বুদ্ধিজীবি দিবস এবং এই দিনে আসলেই কি নির্মম ইতিহাসের রচনা করেছিলো পাক বাহিনী ওতাদের দোসররা। দুঃখ প্রকাশ করে পুলিশ সুপার বলেন ঢাক-ঢোল পিটিয়েতো আর দেশপ্রেম তৈরি করা যায় না, সেটি অন্তর থেকে তৈরি হতে হয়। সারাদিন আমি স্বাধীনতা স্বাধীনতা বলে বেড়ানোটা বিষয়না, বিষয় হলো আমি অন্তরে ধারণ করলাম কিনা?

এসপি বলেন, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান যারা শহীদ হয়েছে তাদেরকে মনে রাখতে হবে নাহলে আজকে যারা বুদ্ধিজীবী তার উৎসাহ পাবে না এজন্যই যে, আমি দেশের জন্য যাই করি না কেন দেশ তো আমাকে মনে রাখবে না। একটি দিবস পালন করা শুধুমাত্র এই না, যে ঐ দিবসে কি ঘটেছিল তা তুলে ধরা, আসলে একটা দিবস পালন করা হয় এজন্য যে এর মাধ্যমে একটা উৎসাহ তৈরী হয় পাশাপাশি একটি স্বীকৃতি তৈরী হয়। অনুষ্ঠানে সরকারী অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানের প্রধান বা তাদের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ করার বিষয়টি তুলে ধরে এসপি বলেন, আমাদের আতœজিজ্ঞাসার সময় এসেছে, আমাদের উপলব্দির সময় এসেছে, শহীদ বুদ্ধিজীবীদের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

অপরদিকে আলোচনা সভার সঞ্চালক সাংস্কৃতিক কর্মী সাবেক কালচারাল অফিসার মুজিবুল হক বুলবুল বলেছেন, অনুষ্টানের এক পর্যায়ে বলেছিলাম যেসকল সরকারী প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা আজকের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হননি, এটা এক ধরনের বর্জন সংস্কৃতিকে লালন করার মতো। সরকারের পক্ষ থেকে ছুটি ঘোষণার পর এই ধরনের দিবসে উপস্থিতি থাকা আবশ্যক হলেও যারা এই ধরনের অনুষ্ঠান বর্জন করেছেন তারা অপরাধ করেছেন বলে আমি মনে করছি। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে এবং ব্যবস্থা নিতে হবে বলেও যোগ করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে একজন উদ্বর্তন কর্মকর্তা বলেছেন, সত্যিকার অর্থেই আজকের দিননি আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন দিন। এই দিনে আয়োজিত জেলা প্রশাসনের আলোচনা সভায় যারা উপস্থিত হয়নি তাদেরকে জিজ্ঞাসা বা জবাবদিহিতার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

তিনি বলেন, আগামী বিজয় দিবসে আমরা দেখবো দেশ প্রেমে জাগ্রত হয়ে কারা কারা অনুষ্ঠানে ব্যক্তিগত উদ্যোগে আসছে আর কারা কারা আসেনি। এটা আমরা দেখবো। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নির্দেশনা রয়েছে এবং আইনের সুযোগ রয়েছে মন্তব্য করে উদ্বর্তন এই সামরিক কর্মকর্তা বলেছেন, প্রয়োজনে এনফোর্স করে সেসকল কর্মকর্তা বা অফিস প্রদানদের উক্ত অনুষ্ঠানে আনার। এটা করা উচিত এবং আমরা সেটি করার চেষ্ঠা করবো বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

দেশকে মেধাশূন্য করতে ইতিহাসের নির্মমতম হত্যাযজ্ঞ সম্পর্কে আলোচনা করে নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস সম্পর্কে সম্যক ধারনা প্রদান ও রীতিনুসারে শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনার লক্ষ্যে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ১৪ই ডিসেম্বর শনিবার এই আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। দিবসটি পালনে সরকারি নির্দেশনা অনুসারে সরকারী-বেসরকারী প্রায় সকল অফিসগুলোতে চিঠিও দিয়েছেন রাঙামাটির জেলা প্রশাসক।

এদিকে অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশিদ বলেছেন, এই ধরনের অনুষ্ঠানে নিজ থেকেই আত্মউপলব্দির মাধ্যমে উপস্থিত হতে হয়। এতে করে ইতিহাস জানা যায়, শেখা যায়। যারা এই ধরনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়না তাদের মাঝে দেশপ্রেমের ঘাটতি থাকে বলেও মন্তব্য করেছেন জেলা প্রশাসক।