ব্রেকিং নিউজ

রাঙামাটিতে ১ বছরে ৮৮ ময়নাতদন্ত: বাড়ছে আত্মহত্যার প্রবণতা!

॥ আলমগীর মানিক ॥

পাহাড়ি জেলা রাঙামাটিতে সন্ত্রাস একটি প্রধান সমস্যা। কিন্তু এই সমস্যার পাশাপাশি পিছিয়ে পড়া এই জেলায় সামাজিক অস্থীরতার প্রবণতাও দিনদিন বাড়ছে। বিগত ২০১৯ সালে রাঙামাটি জেলায় বেশ কিছু সন্ত্রাসী ঘটনার সাথে অস্বাভাবিক মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়ে যাওয়ায় উদ্যোগ প্রকাশ করেছে সমাজ সচেতন ব্যক্তিরা।

বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যানুসারে বিগত এক বছরে রাঙামাটি জেলায় অপমৃত্যু ও সন্ত্রাসী হামলায় শতাধিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে ৮৮জনের ময়নাতদন্ত হয়েছে রাঙামাটির মর্গে। রাঙামাটি স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে জানুয়ারী-৩, ফেব্রুয়ারী-৬, মার্চ-৭, এপ্রিল-৫, মে-১০, জুন-১৫, জুলাই-৮, আগষ্ট-৬, সেপ্টেম্বর-৯, অক্টোবর-১০, নভেম্বর-১০ ও ডিসেম্বর-৫ জনসহ সর্বমোট ৮৮জন মৃত ব্যক্তিকে রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত করা হয়েছে।

হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাঃ শওকত আকবর খান তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, জেনারেল হাসপাতালের মর্গে গত এক বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালে ময়নাতদন্ত হওয়া মৃতদের মধ্যে অন্তত ৩২ জনের মতো আত্মহত্যায় মৃত্যু হয়েছে এবং মৃতদের প্রায় সকলেই টিন এজার।

সম্প্রতি রাঙামাটি শহরের মানিকছড়ি এলাকায় মুঠোফোনে প্রেমিকের সাথে সামান্য কথা কাটাকাটিকে কেন্দ্র করে সভ্রান্ত পরিবারের এক কিশোরী কন্যা আত্মহত্যার ঘটনায় খবর নিতে গিয়ে জানা গেছে, গত ২০১৯ সালে এক বছরে রাঙামাটিতে অন্তত ৪০জন কিশোর-কিশোরী আত্মহত্যা করেছে। যাদের অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘোষণা দিয়ে আত্মহত্যা করেছে।

বিষয়টি নিয়ে বেশ ভাবিয়ে তুলেছে অভিভাবকদের। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যের সাথে এ সংখ্যার সামান্য তারতম্য থাকলেও সূত্রমতে সব আত্মহত্যা সব সময় ময়না তদন্ত হয় না।

রাঙামাটির সাবেক নারী সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ মহিলা সংস্থা রাঙামাটির চেয়ারম্যান ফিরোজা বেগম চিনু বলেছেন, আমি মনে পারিবারিক ও সামাজিক অবহেলা, পারিবারিক সহিংসতা এবং যৌন নিপীড়নের শিকার হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে কিশোর-কিশোরীরা।

অপরিণত বয়সে প্রেম, আত্মযন্ত্রণা এবং আত্মপীড়নের কারণেও তারা বেছে নিচ্ছে আত্মহত্যার পথ। পারস্পরিক যোগাযোগ-বৈকল্য, অভিমান, আবেগ, নিঃসঙ্গতা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা শেয়ার করতে না পেরে নিজেকেই পৃথিবী থেকে সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় অনেক কিশোর-কিশোরী, যা মোটেও কাম্য নয়।

এদিকে অধিকাংশ ময়নাতদন্তকাজে অংশগ্রহণ করা রাঙামাটির বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডাঃ শওকত আকবর খান বলেছেন, বর্তমান সময়ে তথ্য প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহারে আমাদের ছেলেমেয়েদের মাঝে মানবিক মূল্যবোধ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

যার ফলে তাদের নিজস্ব চিন্তা-চেতনায় বেড়েছে নিষ্ঠুরতার আধিপত্য। তিনি বলেন, পরিবারের সদস্য এবং স্বজনদের সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব একটি বিষয়। এখনকার কিশোর-কিশোরীরা কিছুটা রোবোটিক সাইকোলজির হয়ে থাকে।

বিশেষ করে নগরে বসবাসকারী পরিবারের কিশোর-কিশোরীরা সাইবার জগৎ নিয়ে দিন-রাত পড়ে থাকে। সাইবার জগতের প্রতি বেশিমাত্রায় ঝুঁকে পড়ার কারণে কাছের মানুষটিও তাদের কাছে গৌণ বিষয় হয়ে যায়।

সাইবার জগৎ কেড়ে নিচ্ছে মানবিক মূল্যবোধ ও কৈশোর। ফলে পারিবারিক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি কিংবা পরিবারের সদস্যদের প্রতি মমতা তৈরি হয় না। আত্মহত্যাও তার কাছে একটি গেমের মতো। তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে তারা আত্মহত্যার মতো ভয়াবহ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে।যা আমরা মোটেও ভাবি না। তিনি বলেন, আমরা অভিভাবকরা ভাবি, আমার ছেলেটি কিংবা মেয়েটি সর্বগুণে গুণান্বিত হয়ে ‘মানুষের মতো মানুষ’ হোক।

এ কারণে বাচ্চাগুলোকে নিয়মিত পড়াশোনার বাইরে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড সবকিছুতে প্রথম হওয়ার জন্য মানসিক চাপ সৃষ্টি করি। এতকিছু করতে গিয়ে বাবা-মায়েরা ভাবেন না, ছেয়ে-মেয়েদের ওপর কতটা মানসিক চাপ পড়ছে।

ফলে ‘কিছুই পারছি না’ এমন মনোভাব অনেক কিশোর-কিশোরীকে ঠেলে দেয় আত্মহননের দিকে। এটি হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। এথেকে পরিত্রাণে আমাদের সকলকেই পারিবারিক বন্ধন সম্মৃদ্ধশীল করতে হবে। প্রকৃতির সাথে বন্ধুত্ব বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই মন্তব্য করে তিনি বলেন, সন্তানদের সময় দিতে হবে এবং তাদের অন্যতম বন্ধু হতে হবে পিতা-মাতা বা অভিভাবকদের।