রাঙামাটিতে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের পুলিশি তদন্তের পরই নিয়োগ চুড়ান্ত হবে

॥ সৌরভ দে ॥

রাঙামাটি জেলায় চলমান প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের ফলাফল চুড়ান্ত হয়েছে। তবে এখনো নিয়োগপত্র ইস্যু করা হয়নি। জানা গেছে, এবার নিয়োগপত্র প্রদানের আগেই প্রার্থীদের পুলিশ ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করা হবে। এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে উত্তীর্ণদের দেওয়া তথ্যাবলী ও সনদের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য কাজও শুরু করেছে পুলিশ। রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদে হস্তান্তরিত বিভাগ হিসেবে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগে সহকারী শিক্ষক নিয়োগের লক্ষ্যে বেশ কিছুদিন ধরেই নিয়োগ প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে জেলা পরিষদ। ইতোমধ্যে প্রার্থীদের লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা তথা উত্তীর্ণদের তালিকাও প্রকাশ করা হয়েছে। উত্তীর্ণরা নিজেদের নাম চুড়ান্ত তালিকায় পাওয়ার পরও নিয়োগপত্র না পাওয়ায় চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে। নিয়োগের আগেই পুলিশ ভেরিফিকেশন হওয়ার বিষয়টিকে নতুন উল্লেখ করে এই কালক্ষেপনের জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বেশ কিছু অভিভাবক।

পুলিশি তদন্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রাঙামাটি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার খোরশেদ আলম। তিনি জানান, এখনো চূড়ান্তভাবে কারো নিয়োগ হয়েছে এটা বলা যাবে না। এখন পর্যন্ত শুধু যোগ্য প্রার্থীদের নির্বাচন করা হয়েছে। কারো বিষয়ে নেতিবাচক পুলিশ রিপোর্ট পাওয়া গেলে তিনি নিয়োগপত্র পাবেন না।

নিয়োগের আগেই পুলিশ ভেরিফিকেশন নতুন নিয়ম বলে অভিযোগের বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার জানান, আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর দেখেছি পাহাড়ে প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশন হয় না। এই না হওয়াটা একটা সমস্যা। মৌখিক পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে দেখেছি অনেকেই দুই উপজেলার নাগরিকত্বের সনদ দাখিল করেছে, আমি তাদের মৌখিকেই বাতিল করে দিয়েছি, কিন্তু অনেকেই হয়ত ভুয়া নাগরিকত্বের সনদ দাখিল করে থাকতে পারেন সেই বিষয়টি যাচাইয়ের জন্য পুলিশ ভেরিফিকেশন আগেই সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তিনি যোগ করেন যে, আমরা চেষ্টা করছি এইবার পুলিশবাহিনীতে যে স্বচ্ছ নিয়োগটি হয়েছে সেই আঙ্গিকে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে। এ ক্ষেত্রে অনেক প্রতিবন্ধকতাও ছিল, কিন্তু আমি বদ্ধপরিকর ছিলাম। অনেক চাপের মধ্যেও আমি সম্পুর্ণ নিয়োগ প্রক্রিয়াটি যথাসম্ভব স্বচ্ছতার সাথে সম্পন্ন করার চেষ্টা করেছি। এই কারণে অনেকের বিরাগভাজনও হয়েছি।

এদিকে এই নিয়োগ নিয়ে অনলাইন ও অফলাইনে নানা সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। অনেকে কোন ঘুষ ছাড়া চাকরি পেয়ে যেমন উচ্ছ্বসিত, তেমনি অনেকেই নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়ে নানা প্রশ্নও তুলছে। এরমধ্যে স্থায়ী বাসিন্দার সনদ জালিয়াতির বেশ কয়েকটি অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এইবারের সহকারী শিক্ষক নিয়োগে জুরাছড়ির স্থায়ী বাসিন্দার সার্টিফিকেট জমা দিয়ে লিখিত ও মৌখিক উভয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চূড়ান্তভাবে মনোনীত হয়েছেন রিমি বড়ুয়া নামে এক প্রার্থী। যার রোল নং ০২৭। জুরাছড়ি থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত এগার জনের মধ্যে একজন তিনি। উক্ত প্রার্থীর বিরুদ্ধে জুরাছড়ি ছাত্রলীগ সভাপতি জ্ঞানমিত্র চাকমা ও সাধারণ সম্পাদক সুদিপ্ত চাকমা জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের নিকট লিখিত অভিযোগ প্রেরণ করেন। জুরাছড়ি সদর ইউপি চেয়ারম্যান ক্যানন চাকমার প্রত্যয়ন পত্রের সংযুক্তিসহ তারা অভিযোগ করেন, এই প্রার্থীর জুরাছড়িতে কোন স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বা কোন প্রকার জমিজমা নেই। প্রার্থীর স্থায়ী বাসিন্দার সার্টিফিকেট ভুয়া ও নকল। তারা জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের নিকট এই প্রার্থীর আবেদন বাতিলের অনুরোধ করেন।

জুরাছড়ি সদর ইউপি চেয়ারম্যান ক্যানন চাকমা জানান, জুরাছড়ি উপজেলায় রিমি বড়ুয়া নামে কারো অস্তিত্ব নেই। সুতরাং তিনি কিভাবে জুরাছড়ি উপজেলার হয়ে চাকরিতে নিয়োগ পেলেন সেটাই আশ্চর্য্যরে বিষয়।

জুড়াছড়ি উপজেলা ছাড়াও রাঙামাটির বরকল উপজেলা থেকে তৃষা চক্রবর্তী নামক আরো একজনের চাকুরী হয়েছে বলে জানা গেছে। তার বিরুদ্ধেও জুড়াছড়ির মতো স্থায়ী বাসিন্দার সনদ জাল বলে জানা গেছে। যিনি অত্র উপজেলায় বহিরাগত বলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন অত্র এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা ও অত্র পরীক্ষায় অংশগ্রহনকরী চাকুরী বঞ্চিত পরীক্ষার্থীরা। জানা গেছে, অভিযুক্ত তৃষা চক্রবর্তী রাঙামাটি শহরের মাঝের বস্তি এলাকার ৩নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা পিতাঃ তরুন চক্রবর্তী এবং মাতাঃ শুক্রা চক্রবর্তীর সন্তান। অভিযুক্ত ব্যক্তি আইমাছড়া ইউনিয়নের দক্ষিন কলাবুনিয়া ২নং ওয়ার্ডের বাসীন্দা সেজে অত্র ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কর্তৃক প্রদত্ত স্থায়ী বাসিন্দার সনদ ব্যবহার করে সহঃ শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহন করেছে বলে জানা গেছে।

এবিষয়ে অত্র উপজেলার আওয়ামী লীগের নেতা, ৪নং ভুষনছড়া ইউপি চেয়ারম্যান মো মামুনুর রশীদ মামুন স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীকে জানিয়েছেন, উক্ত সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় শর্ত ছিলো ভুয়া তথ্যাদি দিয়ে কেউ অংশগ্রহণ করলে তার নিয়োগ বাতিল হিসেবে গণ্য করা হবে। অভিযুক্ত তৃষা চক্রবর্তী অত্র উপজেলার স্থায়ী বাসীন্দা নয়। এক্ষেত্রে তিনি নিয়োগ শর্তের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করেছেন বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

এ ধরনের প্রতারনামূলক মিথ্যা তথ্য দিয়ে ভূয়া সনদের মাধ্যমে এইরকম আরো বেশকিছু অভিযোগ অনুসন্ধানের প্রেক্ষিতে রাঙামাটি জেলায় প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে তথ্য চাওয়া হলে কর্তৃপক্ষ জেলা পরিষদের অনুমতি ব্যতীত তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন।