বাঘাইছড়িতে সশস্ত্র হামলার ১ বছর:মূলহোতা পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা এখনো ধরাছোয়ার বাইরে

॥ আলমগীর মানিক ॥

নির্বাচনী দায়িত্বপালন করতে গিয়ে পাহাড়ের সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত বাঘাইছড়ির আটজন নিহত ও ৩৩ জন আহত হওয়ার ঘটনার আজ এক বছর। ২০১৯ সালের ১৮ই মার্চ বিকেলে নির্বাচনকালীন সরকারী দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে গুলি খাওয়া এসব মানুষের পরিবার সরকারী নিয়মানুসারে ঘোষিত ক্ষতিপূরণ পেলেও এক বছরেও সেই ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার কোনো সুরাহা হয়নি। ন্যাক্কারজনক ঐ ঘটনায় মর্মান্তিকভাবে আহতদের অনেকেই এখনো পঙ্গু অবস্থায় জীবনযাপন করছে, ফিরতে পারেনি স্বাভাবিক জীবনে। সেদিনে নিরাপত্তা বাহিনীকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চালানো সেই সশস্ত্র হামলার নেতৃত্বে থাকা পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা এখনো রয়েগেছে ধরাছোয়ার বাইরে।

২০১৯ সালের ১৮ই মার্চ রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে নির্বাচনী দায়িত্ব পালন শেষে কেন্দ্র থেকে ফেরার পথে বাঘাইছড়ির ৯ কিলো নামক স্থানে অস্ত্রধারী পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা অতর্কিত সশস্ত্র হামলা চালায়। এই হামলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে সর্বমোট আটজন নিহত হওয়ার পাশাপাশি অন্তত ৩৩ জন আহত হয়। এই ঘটনায় কেউই এগিয়ে না আসায় দুইদিন পর বাঘাইছড়ি থানা পুলিশের এসআই আকতার হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ৪০/৫০ জনের কথা উল্লেখ করে মামল দায়ের করেছিলেন। যার মামলা নং-০২,তারিখঃ ২০-০৩-১৯ইং। রাঙামাটি জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ ছুফি উল্লাহ জানিয়েছেন সেসময় উক্ত ঘটনায় বাঘাইছড়ি থানায় দায়েরকৃত মামলায় এ পর্যন্ত ১৪জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং বাকি সন্ত্রাসীদেরকেও গ্রেফতারের চেষ্ঠা অব্যাহত আছে।

এদিকে এই সন্ত্রাসী হামলার ঘটনার এক বছর পার হলেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি আহতদের অনেকেই, এখনো দুঃসহ কষ্টনিয়ে পঙ্গু অবস্থায় পড়ে আছেন কেউ কেউ। আহতদের মধ্যে টাকার অভাবে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে নাপেরে পঙ্গু অবস্থায় যন্ত্রনা নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে সাজেকের বেটলিং সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ফুলকুমারি চাকমা। সেদিনের হামলার ঘটনারপর সেনাবাহিনীর সহায়তায় দীর্ঘদিন ঢাকা সিএমএইচে চিকিৎসাধীন থাকলেও সেখানে আর চিকিৎসা হবেনা জানিয়ে বিদেশে নেয়ার পরামর্শ দেয় সিএমএইচ কর্তৃপক্ষ। অর্থনৈতিক টানাপোড়নে এখন আর চিকিৎসা করাতে পারছেনা দরিদ্র ফুলকুমারির পরিবার। দু সন্তান নিয়ে কোনরকম টিকে আছে তারা। তাই উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রধানমন্ত্রীর সহযোগীতা চেয়েছে তার স্বামী হেমন্ত চাকমা।

এদিকে, এরই মধ্যে “টাকার অভাবে উন্নত চিকিৎসা হচ্ছেনা ফুলকুমারীর”বিষয়টি জানার পর বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তা আহসান হাবিব জিতু মঙ্গলবার (১৭ই মার্চ) দুপুরে ফুলকুমারির বাড়ীতে যান। এসময় তিনি আহত ফুলকুমারীর অসুস্থতার সার্বিক বিষয় জানতে চাইল ফুলকুমারির পরিবার তাকে জানায়, উন্নত চিকিৎসায় প্রয়োজন ২০ লাখ টাকার। এসময় ফুলকুমারীর সুচিকিৎসার ব্যাপারে সহায়তার আশ্বাস প্রধান করে ইএনও বলেন, আগামী একমাসের মধ্যে চিকিৎসা ব্যয় ২০লাখ টাকার আর্থিক সহায়তা তহবিল গঠনের মাধ্যমে সংগ্রহ করে দিবেন তিনি।

বিষয়টি নিয়ে মঙ্গলবার বিকেলেই ইউএনও’র উদ্যোগে বাঘাইছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান সুদর্শন চাকমাকে সভাপতি করে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

বাঘাইছড়ি উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল কাইয়ুম সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন আমরা তহবিল গঠনের উদ্যোগ ইতিমধ্যেই নিয়েছি।

চেয়ারম্যান সুদর্শন চাকমা কমিটির বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছেন, আমরা খুব শীঘ্রই তার প্রয়োজনীয় ২০ লাখ টাকার ব্যবস্থা করে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্যে বিদেশে পাঠাতে পারবো।

এদিকে বাঘাইছড়ি প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা আওয়ামীলীগের নেতা মোঃ গিয়াস উদ্দিন জানিয়েছেন, ফুলকুমারীর চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতে বাঘাইছড়িবাসীর পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে।

বাঘাইছড়ি উপজেলার ইউএনও আহসান হাবিব জিতু বলেন, আমাদের সরকারী চাকুরীজীবিদের একদিনের বেতন এবং আমার দপ্তরের সকলের সহযোগীতায় আহত ফুলকুমারীসহ ও অন্য আহতদের চিকিৎসার খরচ বাবদ সর্বমোট ৩০লক্ষ টাকার একটি ফান্ড গঠন করা হবে। ফুল কুমারীর বিদেশে উন্নত চিতিৎসায় ২০ লক্ষ টাকা ব্যায় হবে এবং অন্যদের সহযোগীতায় বাকি টাকা ব্যয় হবে। চাইলে যে কেউ এই কাজের সহযোগী হতে পারবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

প্রসঙ্গত: বিগত ২০১৯ সালে ১৮মার্চ ৫ম উপজেলা নিবার্চনী সহিংসতায় বাঘাইছড়িতে সন্ত্রাসী হামলায় ৮জন নিহত ও ৩৩ জন আহত হয়। এই ঘটনায় নির্বাচন কমিশন আর্থিক সহায়তা প্রদান করলেও তাতে চিকিৎসা ব্যয় বহন সম্ভব হয়ে উঠেনি আহত অনেকের। তাই আহতদের চিকিৎসায় উপজেলা প্রশাসনের এমন মহতী উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে সচেতন মহল।