প্রত্যক্ষদর্শী হুমায়ুনের জবানিতে যেমন ছিল সেই ভয়াল দিন

॥ ওমর ফারুক সুমন ॥

আজ ১৮ই মার্চ। কারো কারো কাছে এই দিনটা অন্য আর দশটা দিনের মত মনে হলেও আমার কাছে তা একেবারেই ব্যতিক্রম। এই দিনে চোখের সামনে অনেকগুলো তাজ প্রাণ ঝরতে দেখেছি। দেখেছি শত শত বুলেটের লালচে আভা, দেখেছি মানুষের দেহ বুলেটের আঘাতে ঝাঝরা হতে। আমি বাঘাইছড়ি ট্রাজেডির কথাই বলছি। ১৮ই মার্চ ২০১৯ আজকের এই দিনটা কতটা ভয়াবহ ছিল তা শুধু ঐ দিন বেঁচে ফেরা মানুষগুলোই অনুধাবন করতে পারে।

নানান প্রেক্ষাপটের হিসাব নিকাশ না বুঝা সাধারন মানুষগুলো তাদের নির্বাচনী দায়িত্ব পালন শেষে ফিরছিলেন নিজ গন্তব্যে। তারা কেউই জানতো না জয় পরাজয়ের হিসেব মিলাতে তাদের প্রাণ হারানো নির্ধারিত ছিল কোন এক পক্ষের সন্ত্রাসীদের হাতে। তারাতো ফিরছিলো তাদের আপন মানুষগুলোর কাছে যেখানে ফিরবে বলে কথা দিয়েছিল স্বজনদের। তারা জানতোনা সেদিনের অস্তগামী সূর্যের লাল আভাটাই তাদের দেখা শেষ সূর্যাস্ত। মাত্রই সূর্যটা ডুবলো আর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা বিজিবির গাড়িটার হুইছেলটা বাজানো শুরু হলো কেবল। এর মিনিট দশেক পরেই যা ঘটলো তা আমরা কেউ ভাবতেও পারিনি।মুহুর্তের মধ্যেই সব দৃশ্যপট পাল্টে গেল। হাজারো আগুনের ফুলকি আর মুহুর্মুহু গুলির শব্দ চলতে থাকলো একটা সময় জুড়ে। শব্দগুলো যখন থামল ততক্ষণে ঠিক কার ভাগ্যে কি ঘটল তা বুঝে ওঠার উপায় ছিলোনা।

পরে যখন দেখলাম সব মানুষগুলো কাতরাচ্ছে তখন নিজেই নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলামনা।প্রায় সবারই শরীরে বুলেটের ক্ষত।সবার কান্নার চিৎকারে আকাশ ভারী হচ্ছিল।কিন্তু গাড়ির গতির কারনে আমি সবার কাছে যাবার সুযোগ পাচ্ছিলাম না।তাদের মধ্যে একজন শুধু পানি চাচ্ছিল যেন তিনি অনেক দিনের তৃষ্ণার্ত। আমার সাধ্য ছিলনা তাকে পানি দেবার কারণ তখনও ফেরার আরো ১০-১২ কিলোমিটার পথ বাকি। এই ১০-১২ কিলোমিটারের পথটা মনে হচ্ছিল শত মাইলের দূরত্ব। জীপ ড্রাইভারদের বীরত্বে যতক্ষণে হাসপাতাল পৌছালাম ততক্ষণে গাড়িগুলো মৃত্যুর বাহনে পরিণত হয়েছে। স্বজনদের আহাজারিতে তখন আকাশ ভারি হতে থাকল।

বিজিবি ও প্রশাসনের সহায়তাই আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হলেও মৃত্যুর সংখ্যা তখনও বাড়ছিলো।তারপর যা হলো তা করোরই অজানা নয়। নিহত ৭ জনের সাথে আহত প্রায় ৩০ জন।

৭ই এপ্রিল ২০১৯ নির্বাচন কমিশনের প্রধান আসলেন। তিনি নিহত ও আহত পরিবারগুলোকে আর্থিক সহযোগীতা দিয়ে গেলেন। প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেলেন সকলের পুনর্বাসনের। স্থানীয় প্রশাসন ও আশ্বাস দিলেন সহযোগীতার। আজ সেই ট্রাজেডির এক বছর পূর্ণ হলো। তাদের দেওয়া সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হলো ছিটেফোঁটা মাত্র। সেদিন আমার সাথে থাকা দুই সহকারী শিক্ষকের ১জন প্রায় ৯ মাস তার কাধে বুলেট নিয়ে কি কঠিন সময়টা পার করছিলেন তা কেবল তিনিই বুঝতে পারেন। কষ্ট আর যন্ত্রনা সহ্য করতে না পেরে জীবনের ঝুকি নিয়ে অপারেশন করালেন নিজ খরচে। অন্যজনের হাততো এখনও সংকটাপন্ন। অন্য হতাহতদের সাথে যখন দেখা হয় তাদের কিছু জিজ্ঞেস করলেই চোখের পানি চলে আসে তাদের। কেউ খবর রাখেনি তাদের।কেউ তাদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়নি। নিজ প্রচেষ্টায় দু-একজনের ভাগ্যের কিছুটা পরিবর্তন হলেও বাকিরা কেউ পায়নি সরকারি কোন সুযোগ সুবিধা। দিনশেষে তাদের দীর্ঘশ্বাসগুলো আরো দীর্ঘায়িত হয়। তাদের স্বজন হারোনোর ক্ষতি করোর পক্ষেই মেটানো সম্ভব হয়ত নয়।

তবুও একজন ভিকটিম হিসেবে বলতে ইচ্ছে করে নিহত ও আহত পরিবারগুলোকে পুনর্বাসন করে তাদের অসহায় পরিবারগুলোর পাশে দাড়ানো খুব দরকার। হয়ত এতে সেদিনের শহীদদের আত্নাগুলো শান্তি পাবে। প্রশাসনের সূদৃষ্টিই পারে তাদের এই অসহায়ত্ব থেকে মুক্তি দিতে।

– মোঃ হুমায়ুন রশিদ (পোলিং অফিসার, রুইলুই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়)
সেই ভয়াল দিনের অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শী