ব্রেকিং নিউজ

ডাক্তারদের করোনা আতঙ্কে বিনা চিকিৎসায় মারা গেলো ঢাবি শিক্ষার্থী সুমন চাকমা

॥ নিজস্ব প্রতিবেদক ॥

“আমার করোনা হয়নি, অথচ পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে করোনার জন্যেই আমাকে মারা যেতে হবে”- ২৬ মার্চ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এমনটাই জানিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুমন চাকমা। সোমবার (৬ এপ্রিল ২০২০)সকাল ৮.৩৩ টার ঠিকই ওই শিক্ষার্থী চিরবিদায় নিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের ২২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী সুমন। জানা যায়, ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন সুমন। সম্প্রতি তার ফুসফুসজনিত রোগও বেড়েছিল। গত কয়েকদিন ধরে তার শারীরীক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসা জন্য বিভিন্ন হাসপাতালের দ্বারাস্থ হন তিনি। কিন্তু চিকিৎসা নিতে পারেননি।

জানা যায়, অনেকদিন ধরেই সুমন ফুসফুসজনিত রোগে ভুগছিলেন এবং গত কয়েকদিন তার শারীরীক অবস্থার অবনতি হওয়ায় বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরেও চিকিৎসা নিতে পারেননি। করোনা আতঙ্কে পরিস্থিতি এমন একটা পর্যায়ে ঠেকেছে যে, সাধারণ রোগীদেরকেও চিকিৎসা দিতে ভয় পাচ্ছেন ডাক্তাররা।

সুমন চাকমার অসুস্থতা নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে হেনস্থার কথা তুলে ধরে অনুপম চাকমা নামে একজন লিখেছেন,

“১৩ মার্চ। আমি বিকালের দিকে একবন্ধুসহ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুরতে যাচ্ছিলাম। পথিমধ্যে এক সমস্যার কারণে , কোন একসময় যাওয়া হবে ভেবে ঢাবি ক্যাম্পাসে ফিরে আসি। ক্যাম্পাসে পৌঁছে তোমাকে(সুমন চাকমা) আচমকা ফোন দেই এবং তোমার(সুমন চাকমা) অসুস্থতার কথা জানতে পারি। তৎক্ষনাৎ তোমার(সুমন চাকমা) রুমে চলে আসি। সারাদিন খেয়েছো কিনা জিজ্ঞাস করাতেও মিথ্যা বলেছিলে আমি সহজে বুঝতে পারি। যখন কিছু খাইতে দিই, বিছানা থেকে উঠতে পারছিলে না। কোনমতে উঠিয়ে বসালেও কথা বলতে পারছিলে না। যদিও আগে থেকে জানতাম তোমার ভারত থেকে চিকিৎসা করে ফেরার পর কথা বলতে সমস্যা হতো। কোন কারণে গলাটা ঠিকঠাক বের হতো না, আপসোস করতে মন খুলে কথা বলতে না পারাতে।

ঘাড়ে পছন্ড ব্যথা একদম নড়াচড়া করতে পারছিলে না, তবু একগ্লাস পানি দিয়ে তোমার(সুমন চাকমা) অসুখ নিয়ে বিস্তারিত জানতে চাইছিলাম। জানতে পারলাম, সকালে হঠাৎ অসুখটা বেড়ে যাওয়াতে এক ছোটভাইকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেলে গিয়েছিলে। তারা করোনা রোগী সন্দেহে মুগদা জেনারেল হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দিলো। সেখানে সময় নষ্ট করা ছাড়া কোন লাভ হোল না, সেখান থেকে পাঠানো হলো কুর্মিটোলায়। প্রচন্ড মানুষের ভিড়ে সেখানেও কোন চিকিৎসা হলো না এবং বলা হলো বিদেশ ফেরত কিংবা তাদের সংস্পর্শে আসা না হলে তারা কাউকে করোনা টেষ্ট করাবে না। এদিকে তোমার(সুমন চাকমা) করোনা নাই সেটা প্রমাণ না করতে পারলে অন্য কোন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া যাচ্ছে না।

তারপর তুমি(সুমন চাকমা) ল্যাবএইড হাসপাতালে গিয়েছিলে এবং করোনা রোগী ভেবে তারা কোন টেষ্ট না করিয়ে কিছু ঔষুধ দিয়ে বিদায় করে দিলো। তারপর সন্ধ্যা ৮টা নাগাদ তোমাকে(সুমন চাকমা) এ অবস্থায় দেখতে পাই। তারপর শরীর মুছে দিয়ে কিছু ফল খেতে দিই , তখনো তুমি(সুমন চাকমা) ঘাড় সোজা করতে পারছিলে না। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিলো । প্রায় তিন ঘন্টা ঘাড়পিঠ মালিশ করে দিয়ে কিছুতা ভালোবোধ করলে আমি এবং একবন্ধুকে নিয়ে গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যায়। সেখানে গিয়েও কোন লাভ হয়নি। পেয়েছি শুধু জ্ঞানগর্ব অনুপ্রেরণা ও শ্বাসকষ্টের জন্য একটা টেবলেট। সেখানে থেকে পরামর্শ দেয়া হলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে।

যাহোক, তোমার(সুমন চাকমা) চিকিৎসার জন্য জগন্নাথ হলে কোন সুবিধা না দেখে গণস্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে সরাসরি আমার বাসায় নিয়ে আসি। ১৪ মার্চ বিকাল ২টায় পিজিতে ডাক্টারের শরণাপন্ন হই। সেখান থেকে পরামর্শ দেয়া হল সিটিস্ক্যান করে রিপোর্টসহ আরো উন্নত বিশেষজ্ঞ ডাক্টারের শরণাপন্ন হতে। সিটিস্ক্যান রিপোর্ট ল্যাবএইড হাসপাতাল থেকে করিয়ে নিই। ১৬ মার্চ সেই রিপোর্ট নিয়ে আবার পিজি হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ ডাক্টারের সাথে দেখা করি। সেখান থেকে পরামর্শ দেয়া হল জরুরী ঢাকা মেডিকেল অথবা জাতীয় বক্ষ ব্যাধি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিতে। তারপর ঢাকা মেডিক্যালে পুনবার ভর্তির জন্য গেলে সেখানে করোনা সন্দেহে আবারও ভর্তি করা হয়নি। আমি স্বাস্থ্যকর্মীদের সাথে কিছু তর্ক-বিতর্কও করি। কিন্তু কোন লাভ হয়নি। তারপর সেখান থেকে জাতীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতালে চলে যায়। সেখানে পৌঁছতে প্রায় রাত ৯টা বেজে যায়। সেখানে গিয়ে বলা হলো ভর্তির জন্য সিট খালি নেই। একসময় পুরো হাসপাতাল সিট ভর্তি থাকা সত্ত্বেও রোগীদের ভর্তি করিয়ে বারান্দায় রেখে দেয়া হয়, অথচ সিট খালি থাকার পরও মিথ্যা বলে পাঠিয়ে দিলো।”

এদিকে সুমনের মৃত্যুতে শোক ও একই সাথে নিন্দার ঝড় উঠেছে ফেইসবুকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ শাহীন লিখেছেন, “পর পাড়ে ভাল থাকিস ভাই, আমরাই তোকে মেরে ফেললাম”

বাপ্পী চাকমা নামে একজন লিখেছেন, “ভাই আজ তোর মৃত্যর জন্য বাংলাদেশ সরকার দায়ী থাকবে।খুব তো বড় বড় কথা বলে নিউজে দেই করোনা রোগীরা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে?তাহলে কেন আজ তোকে করোনা রোগী না হয়েও বিনা চিকিৎসায় মারা যেতে হলো?”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী অন্তর ত্রিপুরা লিখেছেন, “বিশ্বাস করতে পারছি না দাদা, ওরা আপনাকে বাঁচতে দিলোনা, ওপারে ভালো থাকবেন”