ব্রেকিং নিউজ

রাঙামাটি শহরে পর্যাপ্ত খাদ্য সহায়তার পরেও সমন্বয়হীন ত্রাণ কার্যক্রমে হাহাকার রয়েই গেছে!

॥ আলমগীর মানিক ॥

সরকারীভাবে প্রদত্ত খাদ্য সহায়তার পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যক্তি, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনসহ রাজনৈতিক দলগুলোর মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমের পরও এখনো পর্যন্ত রাঙামাটি শহরের পৌর এলাকায় ত্রাণের জন্য হাহাকার থামছেনা। নিন্মবিত্ত শ্রেণীর ঘরে ঘরে ত্রাণ সহায়তা এরই মধ্যে পৌছে দিয়েছে সরকার। কিন্তু একশ্রেণীর নীতিহীন মানুষের বারংবার ত্রাণ সংগ্রহের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়হীনতার ফলে এখনো পর্যন্ত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ঘনবন্দি মানুষজনের বড় একটি অংশ ত্রাণ পায়নি। এরই মধ্যে পৌরসভা, জেলা প্রশাসন ও জেলা পরিষদ কর্তৃপক্ষ রাঙামাটি শহরের পৌর এলাকায় ১৫৯ মেট্রিক টন চাউলসহ নগদ প্রায় ১৫ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে বলে জানাগেছে। এক লক্ষ ২০ হাজার মানুষের মধ্যে ৬৫ হাজার ভোটারের প্রায় ২৫ হাজার পরিবারের বসবাস রাঙামাটি পৌর এলাকায়।

পৌর মেয়র আকবর হোসেন চৌধুরী জানিয়েছেন এখনো পর্যন্ত শুধু পৌরসভার মাধ্যমেই ১২ হাজার পরিবারের মাঝে খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। অপরদিকে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে এক হাজার পরিবার এবং রাঙামাটি জেলা পরিষদের মাধ্যমে আরো ৩হাজার পরিবারকে খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। এছাড়াও বেসরকারিভাবে রাজনৈতিক দলগুলো, ব্যক্তিগত এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর মাধ্যমে ত্রাণ সহায়তা পেয়েছে অন্তত সাড়ে ১২ হাজার পরিবার।

রাঙামাটির জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশিদ জানিয়েছেন, পৌরসভাকে বরাদ্দ প্রদান করেছেন ১২০ মেট্রিক টন, জেলা প্রশাসন নিজস্বভাবে বিতরণ করেছে ১১ মেট্রিক টন এবং রাঙামাটি জেলা পরিষদ কর্তৃপক্ষ বিতরণ করেছে ২৮ মেট্রিক টন খাদ্য শস্য।

পৌর কর্তৃপক্ষের তথ্যানুসারে শহরে করোনা পূর্ববর্তী পরিস্থিতির তুলনায় বর্তমানে তিনগুণ বেড়ে প্রায় ২৪ হাজার পরিবার ত্রাণ সহায়তা পাওয়ার কথা। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সরকারি-বেসরকারি, ব্যক্তিগত ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর মিলে আজকের দিন পর্যন্ত প্রায় ২৮হাজার ২৫৬টি পরিবারের মাঝে খাদ্য সহায়তা বিতরণ করা হয়েছে। এতোগুলো পরিবারকে খাদ্য সহায়তা প্রদানের পরেও শহরের বিভিন্ন বস্তি এলাকার মানুষজনসহ মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর অনেক বাড়িতেই খাদ্য সহায়তা পায়নি বলে জানিয়েছে তারা।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্টসহ অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে রাঙামাটি শহরে ইতোমধ্যেই পৌরসভা কর্তৃক ১২ হাজার পরিবার, জেলা প্রশাসন ১ হাজার, জেলা পরিষদ ৩ হাজার, অটোরিক্সা শ্রমিক ইউনিয়ন ১৩৫০, জেলা আওয়ামীলীগ ১ হাজার, আব্দুল বারী মাতব্বর ফাউন্ডেশন ১ হাজার, সদর উপজেলা চেয়ারম্যান শহিদুজ্জামান মহসিন রোমান ব্যক্তিগত ১ হাজার, বিএনপি ৮০০, ঠিকাদার ও পরিবহণ ব্যবসায়ি মোঃ মঈন উদ্দিন সেলিম ৮০০, পাবর্ত্য নাগরিক পরিষদ ৬০০, রিজার্ভ বাজার ব্যবসায়ি সমিতি ৫০০, জেলা ছাত্রলীগ ৪০০, শহীদ আব্দুল আলী একাডেমী উচ্চ বিদ্যালয় ৭০০, জেলা জামায়াত ৪০০, সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন স্বপ্ন বুনন ৩৫০,আসবাবপত্র ব্যবসায়ি সমিতি ২০০, বাস শ্রমিক ইউনিয়ন ১৫০, ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়ন ১০০, ইসলামী আন্দোলন ১০০, স্যালভেশন ১৫০, মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ড-৫০, রোটারেক্ট ক্লাব ৩০, কাঠ বাহক বহুমুখী সমবায় সমিতি ১৫০, আমানতবাগ তরুন সামাজিক সংগঠন ২০০, রাঙামাটি ব্লাড ব্যাংক ৪২, তবলছড়ির মৎস্য ব্যবসায়ি মালেক সওদাগর ১৫০, রসুলপুর মসজিদ কমিটি ৭৫, আলম ডক ইয়ার্ড তরুন সংঘ ৮৯, প্রতিভা ক্রিকেট ক্লাব ১০০, গণপতি সংঘ ৩৫, বলাকা ক্লাব ৭১, বিএনপি নেতা এডভোকেট মামুনুর রশিদ মামুন ১৫০, সামাজিক সংগঠন বন্ধু মহল ৬০, ছাত্রনেতা সোহেল ৩১, জেলা ক্রীড়া সংস্থার সেক্রেটারি শফিউল আযম ২৫০, মাষ্টার হারাধন স্মৃতি সংসদ ৮০, রাঙামাটি লঞ্চ মালিক সমিতি ১৪০, স্বর্ণটিলা বিএনপি-আওয়ামীলীগ-২০০, জেলা ছাত্রদল ৫০, বনরূপা স্পোটিং ক্লাব ৩০, কোতয়ালী থানা পুলিশ ৫০, সরকারী কলেজ কর্তৃপক্ষ ১৮৮, সানরাইজ ক্লাবের সভাপতি মোঃ সেলিম ১৬৫, বিএনপি নেতা জামাল ১০০, মনির স্মৃতি ক্লাব ১৮, হাজী এমাদুল ইসলাম ৪০, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন জীবন-অপরাজিতা ১২, জনৈক ভাতৃদ্বয় কর্তৃক ১০০ পরিবারসহ সর্বমোট ২৮২৫৬ পরিবারকে খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।

সাদাচোখে এতগুলো পরিবার ত্রাণ সহায়তা পাওয়ার হিসেব দেখা গেলেও এখনো পর্যন্ত মধ্যবিত্তদের বড় একটি অংশই ত্রান প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিতই থেকে গেছে। এতো পরিমাণ ত্রাণ সহায়তা অব্যাহত রাখার পরেও এখনো কেন ত্রাণের জন্য পৌরবাসিন্দাদের হাহাকার? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানাগেলো, সমন্বয়হীন যে যার মতো করে ত্রাণ বিতরণের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাঝে ভোটের রাজনীতি, আঞ্চলিকতার টান, স্বজনপ্রীতি, দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিসহ সংগঠনগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা ভিত্তিক ত্রাণ বিতরণ সর্বোপরি চরম সমন্বয়হীনতার কারনেই এখনো পর্যন্ত নিন্মবিত্ত, মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর অনেকেই ত্রাণ সহায়তা থেকে বঞ্চিত থেকে গেছে। এমতাবস্থায় বঞ্চিতদের জন্য আরো অতিরিক্ত ১২০ মেট্রিক খাদ্য বরাদ্দ দরকার বলে মন্তব্য করে রাঙামাটি পৌরসভার মেয়র আকবর হোসেন চৌধুরী বলেছেন, আমার পৌর এলাকায় বর্তমান পরিস্তিতি মোকাবেলায় ২৫০ মেট্রিক টন খাদ্য শস্য দরকার। এই বরাদ্দ প্রদান করলে আমি সকলের ঘরে ঘরে প্রধানমন্ত্রীর উপহার পৌছে দিতে পারবো। তবে বর্তমান পরস্থিতি মোকাবেলায় আমাকে জরুরী ভিত্তিতে আপাতত ১২০ মেট্রিকটন বরাদ্দ প্রদানের আহবান জানাচ্ছি আমি। এক প্রশ্নের জবাবে মেয়র বলেন, আমাদের নাগরিকদের মাঝে সততার বড়ই অভাব। একই ঘরের কয়েকজন মিলে ত্রাণ নিতে আসে। একজন যায় মহিলা কাউন্সিলরের কাছে, অন্যজন যায় পুরুষ কাউন্সিলর এবং আরেকজন আসে মেয়রের নিকট। এতে করে বাকিরা বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছে।

এদিকে সমন্বয়হীনভাবে ত্রাণ বিতরনের ফলে এখনো অসন্তোষ থেকেই গেছে মন্তব্য করেছেন সিনিয়র সিটিজেনরা। সুশীল সমাজের প্রতিনিধিগণ মনে করেন একই পরিবারে ৪ বার নাপেয়ে প্রতি পরিবার দুই বার খাদ্য সহায়তা প্রাপ্তি নিশ্চিত হলে অন্তত ১৫ থেকে ২০ দিন তারা চালিয়ে নিতে পারবে।

রাজনীতির বাইরে গিয়ে সচেতন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ওয়ার্ড ভিত্তিক কমিটি গঠন করা একান্ত প্রয়োজন। এই কমিটির সদস্যদের মাধ্যমে ত্রাণ বন্টন করা উচিত এবং পরবর্তী উক্ত সদস্যগণই নিশ্চিত করবে তার এলাকায় কে ত্রাণ পেয়েছে আর কে পায়নি। এতে করে কেউই বাদ যাবেনা। সকলেই ত্রাণের আওতায় আসবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।