ব্রেকিং নিউজ

রাঙামাটির ৪৭ সরকারী অফিসে ২.২৮কোটি টাকার কর বাকি! পৌরসভায় ২মাস বেতন বন্ধ

॥ আলমগীর মানিক ॥

বিশ্বব্যাপী করোনা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ঘরবন্দি মানুষজনের মাঝে যখন খাদ্যের জন্য হাহাকার অবস্থা, এমনিতর সময়েও বেতন-ভাতা পাচ্ছে না পার্বত্য জেলা রাঙামাটির পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারিরা। গত দুই মাস ধরে বেতন না পাওয়ায় এসব কর্মকর্তা-কর্মচারিরা পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম কষ্টে দিনানিপাত করছে। প্রথমশ্রেণীর হয়েও অর্থাভাবে রাঙামাটি পৌরসভা কর্তৃপক্ষ গত দুই মাস ধরেই তাদের ৭৮জন কর্মকর্তা-কর্মচারিকে বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে পারেনি।

এমতাবস্থায় নিধারূন কষ্টের মাঝেও বর্তমান করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় নাগরিকদের সেবা দিয়ে যাচ্ছে রাঙামাটি পৌরসভা কর্তৃপক্ষ। এদিকে, সরকারি বিভিন্ন অফিসগুলোর কাছেই পৌরসভার অনাদায়ি পৌরকর রয়ে গেছে অন্তত সোয়া দুই কোটি টাকা। রাঙামাটি শহরের ৪৭টি সরকারী অফিসে নিয়মিতভাবে পৌরকর আদায়ে ধরনা দিয়েও আশানুরূপভাবে সাড়া পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন পৌর কর্তৃপক্ষ। এছাড়া শহরের পৌরবাসিন্দাদের কাছেও প্রায় দুইকোটি টাকা অনাদায়ি পৌরকর বর্তমান পরিস্থিতিতে আদায় করতে পারছেনা রাঙামাটি পৌরসভা কর্তৃপক্ষ।

মানবিক বিবেচনায় সরকারী অফিসগুলোর পৌরকর পরিশোধের বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারি কল্যাণ সমিতির নেতৃবৃন্দ। তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরেই পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারিদের ভবিষ্যত তহবিল ও আনুতোষিক তহবিলেও কোনো টাকা জমা হচ্ছেনা।

এদিকে, পৌর মেয়র আকবর হোসেন চৌধুরী বলেছেন, অনাদায়ি বকেয়া পৌরকর থেকে অন্তত অর্ধেক পরিমাণও যদি এই মুহুর্তে আমাদের নিকট পরিশোধ করা হয়, তাহলে আমরা পৌর কর্মচারিদের বেতন-ভাতা পরিশোধের পাশাপাশি আমরা দরিদ্র নাগরিকদের মাঝে ত্রাণ সহায়তার পেছনেও এই টাকা ব্যয় করতে পারবেন। এমতাবস্থায় সরকারী অফিসগুলোর প্রধানদেরকে প্রতি বকেয়া পৌরকর পরিশোধের অনুরোধও জানিয়েছেন মেয়র।

রাঙামাটি পৌরসভার অফিসিয়ালি সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানাগেছে, রাঙামাটির প্রথম শ্রেণীর পৌরসভায় সরকারি-বেসরকারি অফিসসহ নাগরিকদের নিয়ে সর্বমোট করদাতা হলো ১৫ হাজার ২৪৫(হোল্ডিংধারী)। নিয়মানুসারে এসব হোল্ডিংধারী প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকদের এর কাছ থেকে প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকা পৌরকর আদায় হওয়ার কথা। অফিসিয়ালী সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন, গণপূর্ত ও গৃহায়ন, স্বরাষ্ট্র, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ক, স্থানীয় সরকার, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণি সম্পদ, সড়ক ও জনপথ অভ্যান্তরীণ সম্পদ, যুব ও ক্রীড়া, সমবায় ও পল্লী এবং বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ রাঙামাটির সর্বমোট ৪৭টি সরকারি অফিসে ২ কোটি ২৮ লাখ ১৫ হাজার ৭৬৭ টাকা পৌরকর বকেয়া রয়েছে। পৌরসভায় বসবাসকারি নাগরিকদের কাছে পৌরকর বাবদ পাওনা বকেয়া রয়েছে আরো অন্তত ২ কোটি টাকা বলে জানিয়েছেন মেয়র আকবর হোসেন চৌধুরী। এদিকে পৌরসভার করশাখার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত বছর পৌরকর আদায় করেছিলেন প্রায় ৬ কোটি টাকা।

পৌর সভার সংশ্লিষ্ট্য সূত্রে জানাগেছে, সরকারি ৪৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বর্তমানে প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (পিটিআই) প্রতিষ্ঠানটির কাছেই পাওনা করের পরিমাণ ৪৩ লাখ৭৮হাজার ৯৮৯টাকা। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে, রাঙামাটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী-১২ লক্ষ ৪১৩০ টাকা, এলজিইডি’র নির্বাহী প্রকৌশলী-৪ লক্ষ ১০,৪৩৫ টাকা, রাঙামাটি বাজার ফান্ড প্রশাসক-১০ লক্ষ ৪৬৭১৬ টাকা, চেয়ারম্যান হ্যাচারী প্রজেক্ট রাঙামাটি-২৭ লাখ ৮১২৩৪ টাকা, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য সচিব-১৪ লক্ষ ৬৮,৭২৩ টাকা, নিউ মার্কেট বাবদ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য সচিব-২ লক্ষ ২৪,৫৯৭ টাকা, রাঙামাটি পর্যটন কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপক-৫ লক্ষ ৬১৮৬৮.৮ টাকা, পরিচালক-জেলা শিল্পকলা একাডেমী-৫ লক্ষ ৫৬,১৪০ টাকা, জেলা জজ কার্যালয়-৪ লক্ষ ২৫,৫০৩ টাকা, জেলা প্রশাসক(পূর্নবাসন কোয়ার্টার)- ৮লক্ষ ৫৬৩৪২ টাকা, সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার-১৩ লক্ষ ৭০,৮০৩ টাকা, নির্বাহী প্রকৌশলী-ম্যাজিস্ট্রেট কোয়াটার-৫ লক্ষ ১৪,৪৯৮ টাকা, নির্বাহী প্রকৌশলী-দুদক কোয়াটার-৪৬,২০৯টাকা, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ষ্টেশন অফিসার-৮৮৭৮৬, অধ্যক্ষ-রাঙামাটি সরকারী মহিলা কলেজ-৪৭৫৩৯৮, প্রধান শিক্ষক-রাঙামাটি সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়-৫১,০৫৭ টাকা, জেলা শিক্ষা অফিসার-১ লক্ষ ১৩,৯১২ টাকা, জেলা প্রাইমারী শিক্ষা অফিসার-৫ লক্ষ ৩৬,৫৩০ টাকা, উপজেলা শিক্ষা অফিসার-৫ লক্ষ ৫৫৪৪৮ টাকা, রাঙামাটি মেডিকেল কলেজ প্রকল্প পরিচালক-২৯,৩১৫, জেনারেল হাসপাতালের সুপারিন্টেডেন্ট-৭ লক্ষ ৫,৮৪০ টাকা, পুরাতন হাসপাতাল-পুরুষ ওয়ার্ড-৩ লক্ষ ২৫৯২২ টাকা।

স্কুল হেলথ-১ লক্ষ ৬১,৪৪৬ টাকা, রাঙামাটি টিবি ক্লিনিক-৩ লক্ষ ২৪,২৭৩ টাকা, আঞ্চলিক জনসংখ্যা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র-৩ লক্ষ ৮১,৮০৩ টাকা, পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপ-পরিচালকের কার্যালয়- ২ লক্ষ ৫৩,৮৬১ টাকা, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহ-প্রকৌশলী-২৮,৩৬৬ টাকা, কাপ্তাইস্থ ওএম ডিবিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী-৫৫৫৪৯, বনরূপাস্থ কৃষি অফিসের অতিরিক্ত পরিচালকের কার্যালয়-৩ লক্ষ ৬৮,৬৪০ টাকা, উপপরিচালক-কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর-১ লক্ষ ৯৩,৪৯৬ টাকা, সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা-৪৩,১২২ টাকা, জেলা মাশরুম উন্নয়ন কর্মকর্তা-৬ লক্ষ ১১,৫২৪ টাকা, রাঙামাটি জেলা মৎস্য সম্পদ কর্মকর্তা-২ লক্ষ ২৪,১৩৮টাকা, রাঙামাটিস্থ ঝুম নিয়ন্ত্রণ বনবিভাগের ডিএফও-৫ লক্ষ ৭০,২৪৮ টাকা, রাঙামাটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের ওয়ার্কসপ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী-১ লক্ষ ৭৮,০৯২ টাকা, সুপারইনটেনডেন্ট-কাস্টম এক্সারসাইজ ও ভ্যাট-২৩,৩৩৪ টাকা, জেলা সমাজ সেবা অধিদপ্তর-শহর সমাজ সেবা কার্যালয়-৬,৪৮৯ টাকা, কো-অর্ডিনিটর-যুব প্রশিক্ষন কেন্দ্র-৯৬,৮৯৩ টাকা, রাঙামাটিস্থ কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংক-১৬৮৫১, রাঙামাটি জেলা ক্রীড়া সংস্থা-২ লক্ষ ১২,০২৪ টাকা, উপপরিচালক-বিএডিসি(বীজ)রাঙামাটি-৪৩,৩০৯ টাকা, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা-বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউট-১ লক্ষ ৭১,২০৭ টাকা, সহ-মহাব্যবস্থাপক বিসিক-১৯২৫১, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান- ৩৯ হাজার ১৮৭ টাকা , একটি বাড়ি একটি খামার-২২,৯৫৮ টাকা ও রাঙামাটি টুরিষ্ট পুলিশের নিকট অনাদায়ী করের পরিমাণ ৪১ হাজার ৩১০ টাকা।

রাঙামাটি পৌরসভার মেয়র জানিয়েছেন, সরকারি অফিসগুলোর সাথে ইতোমধ্যেই পৌরসভার কর্মকর্তাগণ যোগাযোগ করেছেন এবং অনেকগুলো অফিস কর্তৃপক্ষ পৌর প্রদানের ব্যাপারে আশ্বস্থ করেছেন। তিনি বলেন, এই ক্রান্তিলগ্নে আমাদের পৌরবাসিন্দাদের মধ্যে অনেকেই আছেন বিত্তশালী। তারা এরকম একটা সময়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠির পাশেও দাঁড়াচ্ছেন না, আবার পৌরসভার করও দিচ্ছেন না। এদের বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নিবো। মেয়র জানান, ইতিমধ্যেই আমি ঘোষণা করেছি, বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে যে সকল বাড়ির মালিকগণ তাদের ভাড়াটিয়াদের বাড়ি ভাড়া মওকুফ করে দিবে তাদেরকে আমরা পৌরকর শিথিল করে দেওয়া হবে, কিন্তু এতেও আশানুরূপ সাড়া পাননি বলে জানিয়েছেন মেয়র।