ব্রেকিং নিউজ

আনারসবাহী ট্রাকের অনিয়ন্ত্রিত চলাচলে নানিয়ারচর হয়ে উঠতে পারে করোনার হটস্পট!

॥ আলমগীর মানিক ॥

রাঙামাটির মৌসুমী ফলই শেষ পর্যন্ত বুমেরাং হতে পারে পার্বত্য এই জেলার জন্য। বাংলাদেশে ৮ই মার্চ করোনার প্রথমরোগি সনাক্ত হওয়ার পর দীর্ঘ দেড়মাস এই জেলাটি সুরক্ষিত থাকলেও শেষ পর্যন্ত মৌসুমী ফল বাজারজাত করার উছিলায় এই জেলায় ভাইরাস ঢুকে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে জেলার সংশ্লিষ্ট্য সকল কর্তৃপক্ষ। এর পাশাপাশি রয়েছে নারায়নগঞ্জ ঢাকা ও গাজিপুর থেকে আসা পোশাক শ্রমিকরা। ওয়াকিবহাল মহলের তথ্য সঠিক হলে শেষ পর্যন্ত নানিয়ারচরই হতে উঠতে পারে রাঙামাটি জেলার করোনার হট স্পট।

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানাগেছে, নানিয়ারচরে এবছর ২ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে আনারস চাষ হয়েছে। গত বছরের তুলনায় এবছর চাষ বেশি হওয়ায় বাম্পার ফলন হয়েছে। বর্তমানে নানিয়ারচর থেকে প্রতিদিন গড়ে ২৫ থেকে ৩০টি আনারস বোঝাই ট্রাক ঢাকা-ফেনী-নোয়াখালীসহ আরো কয়েকটি জেলায় আসা-যাওয়া করছে। প্রতিটি ট্রাকে কমপক্ষে চারজন লোক আসা যাওয়া করছে। এতে করে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে করোনা ভাইরাস বহন করে নানিয়ারচরে নিয়ে আসতে পারে এবং এটি মানব বোমা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে পুরো রাঙামাটি জেলায়।

নানিয়ারচর উপজেলার বগাছড়ি ও ইসলামপুরের স্থানীয় আনারস চাষী ফারুক ও রবিউল ইসলাম জানিয়েছেন, নানিয়ারচরের বাসিন্দাদের প্রায় সকলেই আনারস চাষের সাথে জড়িত। এমতাবস্থায় সেখানকার শতাধিক আনারস বাগানে ফলনও বেশ ভালো হয়েছে। এরই মধ্যে অর্ধেকাংশ ফল বাগান থেকে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। বাগানের বাকি আনারসগুলো পরিবহন করতে নাপারলে বাগানেই পচে যাবে। এতে করে নানিয়ারচরের পাহাড়ি-বাঙ্গালী উভয় সম্প্রদায়েরর অন্তত ২ হাজার আনারস চাষী ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়বে এবং বর্তমান সময়ে এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠার কোনো বিকল্প নেই।

নানিয়ারচর মৌসুমী ফল ব্যবসায়ি সমিতির সভাপতি ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, আনারসবাহি গাড়িগুলোকে নিয়মিত জীবানুনাশক পানি দিয়ে ধৌত করা হয়। ড্রাইভার-হেলপারসহ সাথে থাকাদের গোসল করিয়ে বাগানের সামনে গাড়িতেই বসিয়ে রাখা হয়। গাড়ির ভেতরেই তাদের খাবারের ব্যবস্থাও করা হয়। তবে সরকারীভাবে যদি নিষিদ্ধ করে তাহলে তারা মালামাল নিয়ে যাবেননা।

অন্যদিকে পাইকারি ব্যবসায়ি রফিকুল ইসলাম জানান, সারাদেশে কাঁচামাল পরিবহনে সরকারই অনুমতি দিয়েছে। তারই আলোকে প্রতিটি গাড়িতে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা লোকসান দিয়ে আনারসভর্তি ট্রাক নিয়ে যাচ্ছি। অন্তত কিছুটা টাকা হলেও যাতে উঠে আসে।

এদিকে রাঙামাটি কৃষি স¤প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক পবন কান্তি চাকমা জানিয়েছেন, বর্তমানে কৃষি সম্প্রসারণের ব্যবস্থাপনায় রাঙামাটিতে কৃষকদের জন্য ৪ হাজার বিঘা জমিতে আউশ বীজ ধানের প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। যদি কোনো আনারস চাষী আউশ ধানের চাষ করতে চান তাকেও এই প্রণোদনা দেওয়া হবে।

এদিকে পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাগণ জানিয়েছেন, এখনো পর্যন্ত রাঙামাটি জেলা করোনা মুক্ত রাখা গেছে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্ঠার মাধ্যমে। কিন্তু এখন যদি করোনা ভাইরাস সংক্রামিত হয়, তাহলে নানিয়ারচর উপজেলার মাধ্যমেই এটি আক্রমণ করবে। একজন উদ্বর্তন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এতোটা পরিশ্রম করে হয়তো শেষ পর্যন্ত আমরা নিজেদের রক্ষা করতে হয়তো পারবো না।

খুবই খারাপ লাগছে যে, আমরা ফল ব্যবসায়ি সমিতির সভাপতিতে ডেকে একটি শর্ত দিয়ে বলেছিলাম, নানিয়ারচরে আনারসবাহি ট্রাকগুলো মাল নামিয়ে দিয়ে ফিরে আসার পর ড্রাইভার হেলপারকে সম্পূর্ন আলাদা করে একটি ঘরে রাখতে হবে এবং রাঙামাটির কোনো লোকজনের সাথে তারা মিশবেনা। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক সেটি মোটেও মানছেনা তারা। এতে করে যেকোনো সময় দুর্ঘটনার শিকার হবে রাঙামাটি। এখনই সবাইকে সম্মিলিতভাবে সহযোগিতার হাত বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই বলেও মন্তব্য করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উদ্বর্তন এক পুলিশ কর্মকর্তা।

এদিকে রাঙামাটিতে পুলিশ, সেনাবাহিনী ও জেলা প্রশাসনের সমন্বিত প্রচেষ্ঠার মধ্যেও সম্প্রতি রাঙামাটিতে কয়েক হাজার পোশাক শ্রমিকের আগমন ঘটেছে। আগতদের এক তৃতীয়াংশই বাঘাইছড়ির বাসিন্দা। এদেরকে স্থানীয় তৃণমুল পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে এসব পোশাকশ্রমিকদের পাহাড়ে আলাদা মাচাংঘরে এবং কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোয়ারেন্টাইনে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে করে স্থানীয়দের আতঙ্ক কিছুটা কমলেও উৎকন্ঠা থেকেই গেছে।

রাঙামাটির সাধারণ প্রশাসন ও শৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর প্রানান্ত প্রচেষ্ঠায় গত দেড়মাস রাঙামাটি সুরক্ষিত থাকায় এই জেলার মানুষ অন্য যেকোনো জেলার তুলনায় কঠোরভাবে অঘোষিত লক ডাউন মেনে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে যাচ্ছে এবং বাধ্য নাগরিকের মতোই কর্মহীন অবস্থায় ঘরে অবস্থান করছে। প্রশাসনের সার্বিক নজরদারির কারনেই যে, এই জেলা এখনো করোনামুক্ত রয়েছে সেই বিষয়টি সর্বস্তরের মানুষ বলাবলিও করছে। তবে একটি উপজেলার অনিয়ন্ত্রিত পরিবহণ ব্যবস্থা পুরো রাঙামাটি জেলার জন্য বুমেরাং হয়ে উঠলে সেই দায় কে নেবে এমন প্রশ্নও উঠেছে সর্বমহলে।