ব্রেকিং নিউজ

হত্যাচেষ্টার ঘটনা চিকিৎসা খরচেই মিটমাট!

॥ ইকবাল হোসেন ॥

রাঙ্গামাটি শহরের দেবাশিষ নগর এলাকায় প্রশাসন নির্দেশিত অঘোষিত লকডাউনের মধ্যে একজনকে ইট দিয়ে আঘাত করে হত্যা চেষ্টার অপরাধ শুধুমাত্র চিকিৎসা খরচ দিয়েই মিটমাটের খবর পাওয়া গেছে। ২ মে সংঘটিত ওই ঘটনার প্রেক্ষিতে আইনী প্রক্রিয়া এড়িয়ে ও জনপ্রতিনিধির সম্মতি ছাড়া স্থানীয়ভাবে বিচারের মাধ্যমে ভিক্টিম পরিবারকে চিকিৎসা খরচ বাবদ মাত্র ৫ হাজার টাকা দিয়ে সম্পূর্ন ঘটনা ধামাচাপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। সচেতন মহল বলছে হত্যাচেষ্টার মত এতবড় একটি অপরাধ করেও শান্তনু ধরের মত অপরাধীরা মাত্র ৫ হাজার টাকা দিয়ে পাড় পেয়ে গেলে তার দ্বারা ভবিষ্যতে বড় ধরণের অপরাধ সংঘঠিত হতে পারে। এই ঘটনায় সম্পূর্ণ এলাকায় ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। স্থানীয় উঠতি বয়সের তরুণ/ তরুণীদের বাবা-মা বলছে শান্তনু এলাকার চিহ্নিত বখাটে। নিজের বাবা মার উপর প্রতিনিয়ত নির্যাতন চালায় সে। এই ছেলে যদি মাত্র ৫ হাজার টাকা দিয়ে এইভাবে ছাড়া পেয়ে যায় তাহলে আমাদের ছেলে মেয়েদের নিরাপত্তা কোথায়?

২ মে কি হয়েছিল?  

২ মে রাত ১০টায় ঘটা ওই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানীতে জানা যায়, দেবাশিষ নগর এলাকায় প্রশাসনের অঘোষিত লকডাউনের সমর্থনে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত বহিরাগতের আগমন রোধে একটি কমিটি গঠন করে এলাকার সচেতন যুব সমাজ। ওই কমিটির একজন সদস্য ছিলেন ঘটনার নির্মম শিকার রুপন বড়ুয়া তাতু (২৭)। রাত ১০টার পরও অভিযুক্ত শান্তনু ধর (৩২) সন্দেহজনকভাবে বাইরে ঘোরাফেরা করতে থাকলে রুপন তাকে বাধা দিয়ে কারণ জিজ্ঞেস করে। এখানেই ঘটনার সূত্রপাত হয় এবং অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে দুইপক্ষের কথা কাটাকাটির জেরে অভিযুক্ত শান্তনু রুপনের মাথায় ইট দিয়ে আঘাত করে। মাথায় ইটের আঘাত লাগার সঙ্গে সঙ্গে রুপন অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে গেলে শান্তনু আবারো একটি ইট ছুঁড়ে মারে তবে ভাগ্যক্রমে সেটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। এরপর গুরুত্বর আহত অবস্থায় রুপন বড়ুয়াকে রাঙ্গামাটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর অবস্থা সংকটাপন্ন দেখে ডাক্তার চিটাগং রেফার করতে চাইলেও করোনা পরিস্থিতির কথা চিন্তা করে অনেকটা ঝুঁকি নিয়ে তাকে রাঙ্গামাটি রেখে দেওয়া হয়। বর্তমানে সে কিছুটা সুস্থ আছে বলে জানা যায়।

পরবরতীতে যা ঘটলো

ঘটনার পরদিন এলাকাবাসী অভিযুক্ত শান্তনুকে গণপিটুনি দিয়ে এলাকায় স্থানীয়ভাবে বিচারের ব্যবস্থা করে। জনপ্রতিনিধিবিহীন ওই বিচারে প্রশাসনের গণজমায়েতের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে দেবাশিষ নগরের বিশাল একটি অংশ উপস্থিত থাকে বলেও  জানা গেছে। ওই বিচারেই ভিক্টিমের পরিবারকে চিকিৎসা খরচ বাবদ মাত্র ৫ হাজার টাকা দিয়ে সম্পূর্ণ বিষয়টিকে মিটমাট করে দেওয়া হয়!

আহত রুপন বড়ুয়ার বড়ভাই নিপন বডুয়ার বক্তব্যঃ 

নিপন বড়ুয়া জানান, এলাকার ক্লাবে বিষয়টি নিয়ে মুরব্বীরা বসার পর ৫হাজার টাকা চিকিৎসা খরচ বাবদ আমাদেরকে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে আমরা তা মানি নাই, তারপরও আমার মায়ের হাতে অনেকটা জোর করে ৫হাজার টাকা তুলে দেয় তারা। এরপর থেকে শান্তনুর পরিবার আমার ভাইয়ের খোঁজখবর নেয়নি। এই ঘটনায় আমি আইনের আশ্রয় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম কিন্তু বর্তমান করোনা পরিস্থিতি আর এলাকার মুরুব্বীদের চাপে আমি ওই সিদ্ধান্ত থেকে সড়ে আসি।

ঘটনার পর বিষয়টি মেয়র মহোদয়কেও অবহিত করা হয়েছিলো, তিনি শান্তনুর বাবা বাদল ধরকে ফোন করে আমার ভাইয়ের চিকিৎসা খরচ চালানোর কথা বললে তখন বাদল ধর রাজি হলেও এখন কোন খোঁজখবর নিচ্ছেন না।

দেবাশিষ নগর তথা ৮ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলরের বক্তব্যঃ 

কাউন্সিলর কালায়ন চাকমা বলেন, আমি ঘটনা জানতে পারার পর বিষয়টি মেয়র মহোদয়কে জানিয়েছি তিনি বাদল ধরকে ফোন করে চিকিৎসা খরচ চালানোর কথা বলেছেন। তবে আমি নিষেধ করেছিলাম এই পরিস্থিতিতে বিচারে না বসতে। আমার অনুরোধ ছিল পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বিচারের বিষয়টি স্থগিত রাখতে যাতে করে ভিক্টিমের পরিবার মানসিক ও শারীরিকভাবে কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠতে পারে কিন্তু আমার কথা মানা হয়নি।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমার ওয়ার্ডে যাতে সবাই শান্তিতে মিলেমিশে বসবাস করে সেজন্য দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছি। আমি চাই এই ধরণের ঘটনা আমার এলাকায় না ঘটুক।

এলাকাবাসীর বক্তব্যঃ 

নাম না প্রকাশ করার শর্তে দেবাশিষ নগরের প্রায় ডজনখানেক বাসিন্দা প্রতিবেদককে জানায়, শান্তনু ধর একজন মাদকাসক্ত। তাকে এর আগে একবার রিহ্যাবে ভর্তি করানো হলেও সে সম্পূর্ণ মেয়াদকাল পূর্ণ করার আগেই চলে আসে। সে প্রতিনিয়ত টাকা পয়সার জন্য নিজের পিতা-মাতাকে নির্যাতন করে। তার নির্যাতনের মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে তার পিতা বিভিন্ন জনপ্রতিনিধির দ্বারস্থ হয়েও বিশেষ কোন সুরাহা পাননি। তার পিতামাতার শুভাকাঙ্ক্ষীরা তাকে কয়েকবার বুঝানোর চেষ্টা করলে সে উল্টা তাদেরকেই বিভিন্নভাবে হুমকি ধামকি দেয়। এই ঘটনায় সম্পূর্ণ এলাকাবাসীই এখন তটস্থ অবস্থায় দিনানিপাত করছে।

অভিযুক্ত শান্তনুর পিতা বাদল ধরের বক্তব্যঃ 

ঘটনার দিন সাংবাদিকদের কাছে সম্পূর্ণ হামলার বিষয়টি অস্বীকার করে উল্টা ভিক্টিমের বাবা কর্তৃক নিজের ঘর ঘেরাও এর দাবী করলেও এখন নিজের ছেলের অপরাধ স্বীকার করে নিয়ে পিতা বাদল ধর জানিয়েছেন, আমি আর আমার স্ত্রী রুপনকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলাম। এলাকার মুরব্বিরা ৫হাজার টাকা চিকিৎসা খরচ বাবদ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো তাও আমি দিয়ে দিয়েছি। যেহেতু সবকিছু লকডাউন অবস্থায় আছে তাই আমি রুপনকে দেখতে যেতে পারছিনা।