ব্রেকিং নিউজ

লকডাউনের ফাঁকে রাঙামাটির নতুন সাজ

॥ শহিদুল ইসলাম হৃদয় ॥

চিনের উহান শহর থেকে জন্ম নেয়া নোভেল করোনা ভাইরাস মরণ ঘাতিতে রুপ নিয়ে বিশ্বের বেশির ভাগ দেশকে অচল করে দিয়েছে বলা চলে তার মধ্যে বাংলাদেশও একটি। সরকার প্রদানের বিচক্ষনতায় করোনা ভাইরাসের আভাস দেশে দেখা দেওয়ার আগ থেকেই দেশের মানুষকে এই ভাইরাস থেকে রক্ষা করতে দেশবাসীকে সচেতনতা অবলম্বনের নির্দেশ দেন এবং মার্চের ৮ তারিখ দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর পরই ২৬শে মার্চ থেকে সারা দেশে অঘোষিত লকডাউনের ঘোষণা দেন। তারই ধারাবাহিকতায় পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতেও ২ মাস যাবত অঘোষিত লকডাউন চলাকালীন সময়ে পাল্টাতে শুরু করে শহরের চেহারা।

দীর্ঘদিন গৃহবন্দী থাকার পর যখন জেলার মানুষ খুব অল্প সময়ের জন্য ঘরের বাহির হচ্ছে ঠিক তখনই যেন নিজ জেলাকে চিনতে হিমশিম খাচ্ছে স্থানীয়রা। প্রিয় শহরটা যেন নতুন সাঁজে সজ্জিত হয়ে বসে আছে হাজারো মানুষের পদচারণার আশায়।

জেলার বেশ কিছু স্পট পরিদর্শন শেষে বলা চলে, পর্যটন জেলা হিসেবে রাঙামাটি শহরটি বর্তমানে পরিপূর্ণ রুপ নিয়েছে। পাহাড়ের গা ঘেষা সরু রাস্তা, এশিয়ার বৃহত্তম কৃত্রিম হ্রদ, পর্যটনের ঝুলন্ত সেতু, প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট সুবলং এর পাহাড়ি ঝর্ণা, পলওয়েল পার্ক, আরন্যক ইত্যাদি দর্শনীয় স্থান দেশি-বিদেশি ভ্রমণ পিপাসু ও স্থানীয়দের কাছে অনেক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। তার সাথে নতুন মাত্রা যোগ দিতে এবং জেলার পর্যটন খাতের উন্নয়ন ও শিশু বিনোদনের লক্ষ্যে জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশিদ রাঙামাটি পার্ককে নতুন রুপ দ্বারা শিশুদের মন উপযোগী করে তুলেছে।

এছাড়াও উক্ত স্পট গুলোর অবকাঠামো মেরামত সহ পর্যটকদের নজর কাড়া বিভিন্ন দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা তৈরী করা হয়েছে। অন্যদিকে অঘোষিত লকডাউনে যখন মানুষ ঘরের বাহির হওয়ার নিষেধাজ্ঞা ছিলো এবং সকল প্রকারের যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকা কালীন সময়ে চট্টগ্রাম-রাঙামাটি সড়ক সহ শহরের অলি-গলির রাস্তা নতুন করে মেরামত করার দৃশ্যও চোখে পড়েছে।

রাঙামাটি জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশিদ বলেন, রাঙামাটি পার্ক বিশেষ করে স্থানীয় ও জেলায় আগত পর্যটকের শিশুদের বিনোদনের জন্য তৈরী করা হয়েছে। পার্কের প্রবেশ পথে বিশেষ পদ্ধতিতে ছোটদের প্রিয় কার্টুন সিরিয়ালের ট্যাটু ব্যবহার করা হয়েছে এবং ভিতরের চিত্রে একটি পাহাড়ি ঝর্ণা নির্মান করা হয়েছে।

এছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিকৃতি, কিড স্লাইটস ও দোলনা, ইলেকট্রনিক ট্রেন ও হেলিকপ্টার ইত্যাদি সহ শুধুমাত্র পার্কে আগত অবিভাবক ও শিশুদের জন্য একটি ক্যান্টিন। শিশুদের বিনোদনের জন্য পার্কটিতে আরো কিছু সংযোজন করার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

রাঙামাটি পর্যটন কর্পোরেশনের ম্যানেজার সৃজন বিকাশ বড়ুয়া বলেন, যদিও করোনার কারণে পর্যটন স্পট বন্ধ এবং পর্যটক বা স্থানীয়দের আগমন শূন্যের কোটায় ছিলো। কিন্তু আমাদের কর্মচারীরা সার্বক্ষনিক কাজ করছে। লকডাউনের সময়ে একটি হানিমুন কটেজের অবকাঠামো মেরামত সহ ব্রিজে উপরে চলাচলের কাঠগুলো নষ্ট হয়ে পরেছে তা পরিবর্তনের পাশাপাশি কর্মীরা নানা কাজে নিয়োজিত আছে।

রাঙামাটি হোটেল মালিক সমিতির সহ-সভাপতি ও রিজার্ভ বাজারস্থ হোটেল হিল সিটির সত্ত্বাধিকারী আনোয়ার মিয়া বানু বলেন, করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে সরকার দেশের সকল পর্যটন স্পট বন্ধ রাখার দরুণ রাঙামাটিতে দেশি বা বিদেশি পর্যটকের আগমন ঘটেনি। ফলে আমরা হোটেল মালিকরা অনেক কষ্টে দিনযাপন করছি। যেহেতু করোনা ভাইরাসের এই দূর্যোগ সারা বিশ্বের ন্যায় আমাদের দেশেরও দূর্যোগ সেহেতু সবার সবকিছু মেনে নিয়ে দেশকে করোনা মুক্ত করতে সরকারের পাশে থেকে সকল প্রকারের দিকনির্দেশনা মানতে হবে। কারণ আমরা সকলেই এদেশের নাগরিক। দেশের এই দূর্যোগ মোকাবেলায় কিছু বিসর্জন দিয়ে হলেও দেশ থেকে করোনা ভাইরাসকে বিদায় দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

মহান রাব্বুল আলামিন বাংলাদেশ ও সারা বিশ্ব থেকে এই দূর্যোগ তুলে নেওয়ার পর দেশ-বিদেশি দর্শনার্থীরা রাঙামাটিকে নতুন আঙ্গিকে দেখতে পাবে কারণ রাঙামাটির পর্যটন খাতে আরো কিছু স্পট যুক্ত হয়েছে এবং পূর্ববর্তী স্পট গুলো মেরামত করা সহ নতুন বিভিন্ন স্থাপনা সংযোজিত হয়েছে। ফলে আশা করছি করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে রাঙামাটিতে বিগত সময়ের তুলনায় পর্যটকের আগমন বৃদ্ধি পাবে এবং এতে করে আমরা হোটেল ব্যবসায়ীরা লাভবান হবো।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, আমাদের রাঙামাটির সৌন্দর্যের কথা বলে শেষ করা যাবেনা। কারণ আমরা এখানকার বাসিন্দা প্রতিদিন শহরের একই দৃশ্য আমাদের চোখে পড়ে। আমার কাছে এমন কখনো মনে হয়নি। এই শহরের পাহাড়, লেক, পাহাড়ি রাস্তা, পর্যটক স্পট গুলো তো প্রতিদিন সকালের ঘুম ভাঙ্গার পর দেখি। একই স্থান সবসময় দেখতে ভাল্লাগেনা তাই মাঝেমধ্যে বাহিরে কোথাও থেকে ঘুরে আসি। রাঙামাটি তো আমার কাছে পুরাতন, কিন্তু আমি বিভিন্ন কাজে দেশের বেশ কিছু টুরিস্ট স্পট ঘুরা হয়েছে। আমাদের রাঙামাটির মত সুন্দর বা মনমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কোথাও দেখিনি।

একটা কথা না বললেই নয়। করোনা ভাইরাসের কারণে যখন রাঙামাটিতে লকডাউন চলছিলো তখন আমাদের চোখের আড়ালে শহরে নতুন অনেক কিছু সংযুক্ত হয়েছে এবং রাস্তা-ঘাটও ঠিক করা হয়েছে। শুধুমাত্র একটি দুঃখের বিষয় করোনার কারণে পর্যটন স্পট গুলো সরকার বন্ধ রেখেছে তাই দীর্ঘ দুমাস পর যখন সরকার সীমিত পরিসরে লকডাউন শিথিল করেছে এবং কর্মস্থলে যোগ দিতে ঘরের বাহির হয়েছি। তখন নিজ শহরের ভালোবাসা ও ভালো লাগার স্থান গুলোতে যেতে পারছিনা। কিন্তু আশাকরি যখন দেশ থেকে এই করোনা ভাইরাসের দূর্যোগ কেটে যাবে তখন আমরা অনেক সৌন্দর্যময় একটি রাঙামাটি উপহার পাবো এবং দেশি-বিদেশি পর্যটকরা এসে আগের চাইতেও বেশি আনন্দ উপভোগ করতে পারবে।