ব্রেকিং নিউজ

গোপালবিহীন গরুর দখলে রাঙামাটির প্রধান প্রধান সড়কঃ অতিষ্ঠ শহরবাসী

॥ সাজিদ বিন জাহিদ ॥

হ্রদ পাহাড়ে ঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি পার্বত্য রাঙামাটি। শহরে যাতায়াতের জন্য একটি প্রধান সড়কের উপরই নির্ভর এই জেলার প্রায় সাড়ে সাত লক্ষ বাসিন্দা। রাঙামাটি জেলার সার্বিক ব্যবস্থাপনায় সুদীর্ঘকাল থেকে নিয়োজিত রয়েছে প্রথম শ্রেণীর রাঙামাটি পৌরসভা। ৯টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত রাঙামাটি পৌরসভার কাছে জনগণের প্রত্যাশা ও চাহিদা আকাশচুম্বী। এর বাস্তবসম্মত কারণও রয়েছে বৈকি! পৌরবাসীর মতে, অতীতের যেকোন সময়ের তুলনায় বিচক্ষণ ও দক্ষ পৌর মেয়র ও তাঁর কাউন্সিলরদের কর্মতৎপরতা পৌরবাসীর মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তবে সাম্প্রতিককালে শহরের রাস্তাগুলোর মধ্যে অবাধে বিচরণ করছে অর্ধশতাধিক বেওয়ারিশ গরু। পৌর এলাকার প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ডের মূল সড়কে যত্রতত্র অবাধ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে গরুগুলো।

ইতোমধ্যেই সড়কের শ্রীবৃদ্ধি করতে পৌরসভার উদ্যোগে ফুটপাতে টাইলস বসানোর উদ্যোগ নিয়েছেন মেয়র আকবর হোসেন চৌধুরী। তবে গরুর গোবর ও গরুর ময়লা খেতে গিয়ে তা চারিপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দেয়া, সকল পরিকল্পনাকে একদম পন্ড করে দিয়েছে। যত্রতত্র গোবর একে পথচারীদের অস্বস্তির কারণ দ্বিতীয়ত করোনা মহামারীর মধ্যে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। সড়কের পুরো নিয়ন্ত্রণ গরুর দ্বারাই এমনটাই মনে হচ্ছে শহরের গত এক সপ্তাহের সরজমিনে সড়ক মনিটরিং করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতেও গরুর এই দিন দুপুরে মূল সড়কে অবাধ বিচরণ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
রাঙামাটি শহরের সড়কগুলো খুব একটা প্রশস্ত না হলেও শহরের অভ্যন্তরীণ যান চলাচলের জন্য যথেষ্ট। সড়ক মানুষ ও যানবাহন চলালচলের জন্য, কিন্তু রাঙামাটির এমন কোন সড়ক নেই যেখানে গরু অবাধে বিচরণ করছে না। কোন নগরবাসী নেই যিনি রাস্তায় চলাচলের সময় এসব অবাধে বিচরণকারী গরুর জন্য সমস্যার সম্মুখীন হননি। অনেকেই ইতিমধ্যে ছোট-বড় দূর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। এই শহরে দিনদিন মানুষ যেভাবে বাড়ছে, যানবাহনও তেমনি বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। রাস্তায় ব্যাক্তিগত যান চালানো এখন একপ্রকার হুমকিস্বরূপ। বর্ষাকালে এমনিতেই দূর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকে। এই অযাচিত গবাদি পশুর অবাধ বিচরণ আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।

রাতেও রাস্তা তাদের দখলে!

শহরের প্রাণকেন্দ্র বনরুপায় বেশ কয়েকটি গরু দলবেঁধে যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে সড়ক পারাপার হয়। পৌরসভার বসানো ডাস্টবিনের দিকে প্রায় দেখা মেলে গরুগুলোর। যানবাহন চলাচলে ব্যাপক প্রতিবন্ধকতা ও দুর্গন্ধের সৃষ্টিতে এই অবলা প্রাণীগুলোর ভূমিকাই সবচেয়ে বেশী। শহরের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বনরুপা, চম্পকনগর, ট্রাইবেল আদাম, রিজার্ভ বাজার, তবলছড়ি, দেবাশিষ নগর, কলেজ গেইট, ভেদভেদীসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষ বাড়িতে গরু লালন পালন করে থাকেন। গরুগুলোর খাওয়ার খরচ সাশ্রয় করতে মালিকেরা দিনে এমনকি রাতেও শহরের বিভিন্ন সড়কে গরু ছেড়ে দিয়ে থাকেন যা অবাধ বিচরণ করে নিজেরাই নিজেদের খাবার জোগাড় করে নিচ্ছে।

রাঙামাটির এক তরুণ আহমেদ কবির ফুয়াদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানান, দীর্ঘদিন ধরে রাঙামাটির প্রায় প্রত্যেক এলাকার রাস্তায় অসংখ্য গরু বিচরণ করে আসছে। এগুলো রাস্তার মাঝে বসে থাকে, চলাফেরা করে, মলমূত্র ত্যাগ করে ময়লা করে রাখে। একে তো রাস্তাগুলো সরু, তার উপর এসব গরুর কারণে রাস্তায় চলার জায়াগা থাকে না। এতে করে রাস্তায় চলাচলকারী, যানবাহনসহ সাধারণ পথচারীদের অসুবিধায় পড়তে হয়। এমনকি অনেকেই দূর্ঘটনার সম্মুখীন হয়েছেন। অথচ রাস্তাঘাট গরু বিচরণের জন্য না। খুব অজপাড়াগাঁয়ের রাস্তায়ও এভাবে গরু ছেড়ে দেয় না, মাঠঘাট কিংবা নির্দিষ্ট জায়গায় চরতে দেয়া হয়। বিভিন্ন জায়গায় এ নিয়ে লেখালেখি হলেও এর সমাধান নিয়ে দায়িত্বশীলদের কেউ ভাবছেন না, এটা হতাশাজনক। প্রশাসনের কাছে অনুরোধ এ ব্যাপারে যেন দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে বড় দূর্ঘটনা থেকে রাঙামাটিবাসীকে রক্ষা করেন।

রাঙামাটির নিরাপদ যান চলাচলে ভূমিকা রাখা HILL Bikers Rangamati গ্রুপে সালাউদ্দিন জুয়েল লিখেছেন, রাঙ্গামাটি শহরে গাড়িচলার রাস্তায় এভাবে গরুপালন খুবই দুঃখ্যজনক, এর ফলে যেমন ঘটে সড়ক দূর্ঘটনা তেমনি গাড়ি চালকদেরও বেগপেতে হয় রাস্তায় গাড়ি চালাতে, রাঙ্গামাটিতে অনেকেই রাস্তায় উম্মুক্ত গরুর থাকার কারনে বাইক একসিডেন্ট করেছেন, তেমনি একজন রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজের শিক্ষক রফিকুল ইসলাম, রাস্তায় গরুর গোবরের কারনেও পরিবেশ নস্ট এবং দূর্ঘটনা ঘটে,আমি এ বিষয়টা গরুর মালিকসহ সকলের দৃস্টি আকর্ষন করছি যাতে এর যথাযথ ব্যাবস্থা নেওয়া হয়।

সমাজকর্মী অমিরাজ দাশ জানান, দিন দিন গরুর চারণভূমি কমে যাওয়ার কারনে গরুগুলোর রাস্তায় বিচরন বেড়েছে। তাই ওদেরকে যদি আগের চারণভূমি ফেরত দেওয়া যায়, তাহলে ওরাও রাস্তায় বিচরণ ছেড়ে দেবে। আপাতত পৌরসভা যদি আগের মতোন তাদের খোয়ার কার্যক্রম পরিচালনা করে তাহলে গরুর মালিকরা আরও সচেতন হতো বলে আমি মনে করি।

তবলছড়ি বাজারের ব্যবসায়ীদের থেকে তাঁদের মতামত জানতে চাওয়া হলে পার্থ চৌধুরী জানান, আমরা এই গরু নিয়ে রীতিমত আতঙ্কে থাকি। আমদের একটু অমনোযোগী পেলেই দোকানের মালামাল নষ্ট করে এই বেওয়ারিশ গরুগুলো। এতে আমাদের ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতি সাধিত হচ্ছে। এছাড়াও দোকানের সামনে মল মূত্র ত্যাগ করে আমাদের ভোগান্তি বাড়িয়ে দিচ্ছে। আমরা এই বিষয়গুলোর দ্রুত সমাধান চাই।

৮নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর কালায়ন চাকমার কাছে এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, রাঙামাটি শহরে পরিকল্পিতভাবে গবাদি পশু লালন-পালনের জন্য কোন খামার গড়ে উঠেনি। ব্যাক্তি পর্যায়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ঘরে একটি কিংবা দুটি গবাদি পশু রয়েছে। এই গবাদি পশুর মালিকেরা আর্থিকভাবে অসচ্ছল এবং অসচেতন। রাঙামাটি পৌরসভার পক্ষ থেকে যথাসাধ্য চেষ্টা করা হচ্ছে সচেতনতা বৃদ্ধিতে। এছাড়াও রাঙামাটি পৌরসভার জনবল সংকট রয়েছে বলেও নিশ্চিত করেছেন তিনি।

তিনি জানান, বারংবার পদক্ষেপ নেয়া সত্ত্বেও গরু লালন-পালন যারা করে থাকেন তাদের মধ্যে নূন্যতম সচেতনতা তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না। মাইকিং করে বস্তুতপক্ষে কোন ফায়দা হচ্ছে না। এছাড়াও হতদরিদ্র গরু মালিকদের জন্য বিভিন্ন মহল থেকে সুপারিশ করা হলে সেটিও ফেলে দেয়া সম্ভব হয়ে উঠে না। তাঁর মতে, এই কারনেই খোঁয়াড়ে গরু আটক করা হলেও সমাধান মিলছে না। উপরন্তু প্রশ্রয় পাচ্ছে গরু মালিকেরা। সুন্দর পরিবেশ বজায় রাখার ক্ষেত্রে তিনি পৌরবাসীর সহযোগিতা কামনা করেন।

তিনি আরো জানান, পৌরবাসীর স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করেই নিয়ম মেনে গবাদি পশু লালন- পালন করতে হবে। বর্ষা মৌসুমে রাস্তা ভাঙ্গা মেরামতেও বাঁধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে এই গবাদি পশুগুলো। যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ করার ফলে দুর্ঘটনার সৃষ্টি হচ্ছে। জরিমানার পরিমাণ বৃদ্ধি ও আটককৃত গবাদি পশুগুলো নিলামে তুলে দৃষ্টান্তমূলক উদাহরণ সৃষ্টির জন্য তিনি সুপারিশ করেন। সমন্বয়হীনতা দূর করে, সচেতন করার আহ্বান জানান তিনি। পৌর মেয়রের সাথে এই ব্যাপারে কথা বলে সমাধান বের করে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এই জনপ্রতিনিধি। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই সকলকে এক কাতারে এসে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

৭ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও রাঙামাটি পৌরসভার প্যানেল মেয়র জামাল উদ্দিন জানান, আমরা যখন গবাদি পশু আমাদের পৌরসভার খোঁয়াড়ে নিয়ে যাই তখন দেখি বেশীরভাগই গরীব মেহনতি মানুষের। এমন অনেক সময় দেখা যায় আমাদের নির্দেশেই আটক করা গবাদি পশু আমাদেরই নিজ পকেটের টাকা খরচ করে মুক্ত করিয়ে নিতে হচ্ছে। আমাদের নিয়ম তো আমরা কোনভাবে অবমাননা করতে পারিনা। বর্তমান পরিস্থিতিতে করোনা মহামারীতে আমরা চাইলেও সকল পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে পারছি না। তাই হয়তো আপাতদৃষ্টিতে আমাদের কাজে কিছুটা স্থবিরতা দেখছে পৌরবাসী। তিনিও তাঁর বক্তব্যে জনবল সংকটের চিত্র তুলে ধরেন। ১৮ জন সেবকের বিভিন্ন মেয়াদে অসুস্থতা ও তাদের সার্বিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে কোন কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না বলেও অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন এই জনপ্রতিনিধি।

তিনি আরো জানান, সেবকের স্বল্পতা থাকার কারনে নগরের ময়লা-আবর্জনা ব্যবস্থাপনা নিয়েই হিমশিম খেতে হচ্ছে। দুই এক দিনের মধ্যেই এই ব্যাপারে দৃশ্যত পদক্ষেপ দেখতে পাবেন পৌরবাসী। এবার কোরবানীর ঈদ সামনে রেখেও পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে নতুন পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।

রাঙামাটি পৌরসভার জনস্বাস্থ্য ২০০৯- এর আইনের (৫০ ধারায়) স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, পৌর কর্তৃপক্ষ বেওয়ারিশ গবাদি পশু আবদ্ধ ও খোঁয়াড়ের ব্যাবস্থা করতে পারবেন। এসব পশুর জন্য জরিমানা ও ফি আদায়ের বিধানও রয়েছে। কিন্তু মানবিক দৃষ্টিকোণ বিবেচনায় কোন কঠোর পদক্ষেপ এখনো নেয়নি পৌর কর্তৃপক্ষ।

এই বিষয়ে রাঙামাটি পৌরসভার মেয়রের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি জানান, আমরা মানবিক আচরণ করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে নিজেরাই আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। নিজের পকেটের টাকা খরচ করে ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজে অনেক গবাদি পশু ছাড়িয়ে দিয়েছি। আমি কখনো নীতির ব্যাপারে আপোষ করিনি এবং আমার কাউন্সিলরেরা আমাকে সার্বিকভাবে এই কাজে সহযোগিতা করে গেছেন। পৌরবাসীকে পৌর কর্তৃপক্ষ সঅবসময় পাশে চায় জানিয়ে, নগর পিতা অনুরোধ করেন যারা গবাদি পশুর জন্য খোঁয়াড়ের ব্যবস্থা করতে অসমর্থ তাঁরা যেন গবাদি পশু লালন-পালন না করেন। এছাড়াও জনস্বাস্থ্যকে প্রাধান্য দিয়ে সামনে কঠোর হবার হুশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। এছাড়াও প্রতিবেদককে ধন্যবাদ জানিয়ে দ্রুততম সময়ে সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেন পৌর মেয়র।