আলমগীর মানিক | ০৯:৪০ পিএম, ২০২৬-০৮-০৮
আলমগীর মানিক
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ কৃত্রিম জলাধার কাপ্তাই হ্রদ। পাহাড়, পানি ও প্রকৃতির অপূর্ব মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই হ্রদ রাঙামাটির অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণ। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকেরা ছুটে আসেন হ্রদের সৌন্দর্য উপভোগ করতে। তবে সম্প্রতি পর্যটনের আড়ালে কাপ্তাই হ্রদে নতুন করে দেখা দিয়েছে উচ্চস্বরে গান-বাজনা ও শব্দদূষণের উৎপাত।
বিশেষ করে ইঞ্জিনচালিত পর্যটক বোটে বড় আকারের সাউন্ড সিস্টেম বসিয়ে বিকট শব্দে গান বাজিয়ে হ্রদে ঘুরে বেড়ানোর প্রবণতা বেড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে কিছু উঠতি বয়সী তরুণ ও নেশাগ্রস্ত যুবক হ্রদের বিভিন্ন এলাকায় উচ্চস্বরে গান-বাজনা বাজিয়ে এক ধরনের উচ্ছৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টি করছে। এতে শুধু হ্রদপাড়ের বাসিন্দারাই অতিষ্ঠ নন, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে হ্রদের স্বাভাবিক পরিবেশও।
কাপ্তাই হ্রদে মাছ ধরা বর্তমানে নিষিদ্ধ। আগামী দুদিন পর নিষেধাজ্ঞা শেষ হলে আবারও হ্রদে মাছ ধরার কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা। এই সময়ে হ্রদের মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ ও প্রজননের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু হ্রদের বিভিন্ন অংশে ইঞ্জিন বোটে উচ্চক্ষমতার সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার করে বিকট শব্দে গান বাজানো নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
হ্রদ পাড়ের বাসিন্দাদের ভাষ্য, বোট যত দূরেই থাকুক, পানির ওপর দিয়ে উচ্চমাত্রার শব্দ অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে রাত কিংবা দিনের নির্দিষ্ট সময়ে বাড়িতে থাকা, পড়াশোনা করা, বিশ্রাম নেওয়া কিংবা স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজকর্মে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে।
স্থানীয় এক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পর্যটকেরা আনন্দ করবেন’’এটা স্বাভাবিক। কিন্তু অন্যের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করে আনন্দ করার কোনো অধিকার কারও নেই। হ্রদে ঘুরতে গিয়ে উচ্চস্বরে গান-বাজনা বাজিয়ে আনন্দ করার বিষয়টি এখন অনেকের কাছেই বিরক্তি ও অসহিষ্ণুতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কাপ্তাই হ্রদ শুধু পর্যটনের কেন্দ্র নয়; এটি পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মৎস্যসম্পদের আধার। বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা এই হ্রদের মাছের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। এ কারণে হ্রদের জলজ পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত শব্দের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলজ প্রাণীর আচরণ, বিচরণ ও প্রজনন পরিবেশের বিভিন্ন ধরনের শব্দ ও মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডের কারণে প্রভাবিত হতে পারে। তাই মৎস্য প্রজনন ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে হ্রদে অপ্রয়োজনীয় উচ্চশব্দ নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, কাপ্তাই হ্রদে পর্যটন অবশ্যই থাকবে; কিন্তু পর্যটনের নামে এমন কোনো কর্মকাণ্ড চালানো উচিত নয়, যাতে হ্রদের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য কিংবা স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কাপ্তাই হ্রদে উচ্চস্বরে গান-বাজনা ও শব্দদূষনের বিষয়টি নতুন নয়। এর আগেও স্থানীয় সচেতন মহলের পক্ষ থেকে রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন সভা ও সম্মেলনে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অতীতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কাপ্তাই হ্রদে উচ্চস্বরে গান-বাজনা নিষিদ্ধ করে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল। একাধিকবার মোবাইল কোর্টও পরিচালিত হয়েছে। ফলে কিছু সময়ের জন্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলেও পরবর্তীতে আবারও একই প্রবণতা ফিরে এসেছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
রাঙামাটি পর্যটননির্ভর জেলা। কাপ্তাই হ্রদকে ঘিরেই জেলার পর্যটনের বড় একটি অংশ গড়ে উঠেছে। ফলে পর্যটকদের স্বাগত জানানো এবং তাদের নিরাপদ ও আনন্দময় ভ্রমণের সুযোগ তৈরি করা প্রশাসনের দায়িত্ব। হ্রদের বুকে বোটে বসে উচ্চস্বরে গান-বাজনা, চিৎকার-চেঁচামেচি কিংবা মাদকাসক্ত অবস্থায় উচ্ছৃঙ্খল আচরণ শুধু স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য বিরক্তিকর নয়; এটি রাঙামাটির পর্যটন পরিবেশ ও ভাবমূর্তির জন্যও নেতিবাচক বার্তা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
বিশেষ করে পরিবার নিয়ে যারা হ্রদপাড়ে বসবাস করেন কিংবা প্রকৃতির নীরবতা উপভোগ করতে চান, তাদের কাছে এসব কর্মকাণ্ড নিঃসন্দেহে অস্বস্তিকর।
স্থানীয়দের প্রশ্ন এখন একটাই! কাপ্তাই হ্রদে উচ্চস্বরে গান-বাজনা ও উচ্ছৃঙ্খলতা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে কে? তাদের দাবি, শুধু নিষেধাজ্ঞা জারি করলেই হবে না; নিষেধাজ্ঞার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিতভাবে বোটগুলোতে নজরদারি, সাউন্ড সিস্টেমের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজন হলে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে পর্যটক বোটের চালক ও মালিকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। কোন বোটে উচ্চশব্দে গান বাজানো হচ্ছে, কোথায় নিয়ম ভাঙা হচ্ছে! এসব বিষয়ে নজরদারির জন্য কার্যকর একটি মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
কাপ্তাই হ্রদকে ঘিরে পর্যটন বাড়ুক; এটাই সবার প্রত্যাশা। কিন্তু সেই পর্যটন যেন হ্রদের পরিবেশ, মৎস্যসম্পদ এবং স্থানীয় মানুষের শান্তিপূর্ণ জীবনযাত্রার জন্য হুমকি হয়ে না দাঁড়ায়, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতির নীরব সৌন্দর্য উপভোগ করতে এসে যদি সেই প্রকৃতির বুকেই শব্দদূষণের উন্মত্ততা তৈরি হয়, তাহলে সেটি পর্যটন নয়! বরং পর্যটনের নামে পরিবেশ ও জনজীবনের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। তাই কাপ্তাই হ্রদে আবারও উচ্চস্বরে গান-বাজনা ও উচ্ছৃঙ্খলতা শুরু হওয়ার আগেই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। নইলে একদিকে যেমন হ্রদের পরিবেশ ও মৎস্যসম্পদ নিয়ে উদ্বেগ বাড়বে, অন্যদিকে হ্রদপাড়ের মানুষের প্রশ্নও আরও জোরালো হবে ‘এদের ঠেকাবে কে?’
মেহেদী হাসান : রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদে মাছ আহরণ করতে গিয়ে পানিতে ডুবে কাজল দাস (৬০) নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে...বিস্তারিত
আজগর আলী খান : রাজস্থলী প্রতিনিধি: সদ্য প্রকাশিত এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে বিপর্যয়ের বিষয়টি পর্যালোচনা করে রাঙাম...বিস্তারিত
আলমগীর মানিক : দীর্ঘ তিন মাস ১৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে আবারও কর্মচাঞ্চল্য ফিরেছে রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদে। সোমবা...বিস্তারিত
আলমগীর মানিক : রাঙামাটিতে পুলিশের বিশেষ অভিযানে লংগদু উপজেলা কৃষক লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. হারুন চৌধুরীকে (৬৫) গ্র...বিস্তারিত
অহিদুল ইসলাম অভি : পাহাড়ি ঢল, টানা বর্ষণ আর পাহাড়ধসে বিপর্যস্ত রাঙামাটি। কোথাও ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব পরিবার, কোথাও ফস...বিস্তারিত
অহিদুল ইসলাম অভি : রাঙামাটিতে দুর্যোগকালীন ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে খাদ্য সহায়তার চাল নিতে উপচেপড়া ভিড়ের সৃষ্টি হয়েছে।...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত © 2026 CHTtimes24 | Developed By Muktodhara Technology Limited