রাঙামাটিতে প্রকাশ্যে দেশি-বিদেশি মদ বিক্রির বিজ্ঞাপন, সাইনবোর্ড ঘিরে তোলপাড়


আলমগীর মানিক    |    ০৬:৫৭ পিএম, ২০২৬-০৮-১৭

রাঙামাটিতে প্রকাশ্যে দেশি-বিদেশি মদ বিক্রির বিজ্ঞাপন, সাইনবোর্ড ঘিরে তোলপাড়

আলমগীর মানিক

 

রাঙামাটি শহরের ঝুলন্ত ব্রিজ এলাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে দেশি-বিদেশি মদ পাওয়ার বিজ্ঞাপন ও মোবাইল নম্বরসংবলিত সাইনবোর্ড টাঙানোকে কেন্দ্র করে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। পর্যটন শহরের ব্যস্ত এলাকায় এমন বিজ্ঞাপন প্রকাশ্যে প্রদর্শনের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা। সচেতন নাগরিকদের প্রশ্ন! লাইসেন্সধারী বার থাকলেও প্রকাশ্য সড়ক বা জনসমাগমস্থলে মদের বিজ্ঞাপন প্রদর্শনের অনুমতি কে দিয়েছে, আর অনুমোদন ছাড়া হলে এর দায়ই বা কার?

জানা গেছে, রাঙামাটি শহরে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের অধীন পর্যটন বারের লিজ নেওয়া প্রতিষ্ঠান এইচ এম এন্টারপ্রাইজ ঝুলন্ত ব্রিজ এলাকায় এসব সাইনবোর্ড টাঙায়। সাইনবোর্ডে দেশি-বিদেশি মদ পাওয়ার তথ্যের পাশাপাশি যোগাযোগের জন্য একটি মোবাইল নাম্বরও উল্লেখ করা হয়। দিনের বেলায় ব্যস্ত এলাকায় সাইনবোর্ডগুলো দৃশ্যমান হওয়ায় বিষয়টি দ্রুত মানুষের নজরে আসে এবং পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, একটি পর্যটন শহরের জনসম্মুখে মদ বিক্রির এমন প্রচার তরুণ সমাজ ও কিশোরদের ওপর কী ধরনের সামাজিক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যেখানে প্রতিদিন দেশ-বিদেশের পর্যটক, পরিবার ও শিক্ষার্থীদের চলাচল রয়েছে, সেখানে প্রকাশ্য মদ বিক্রির প্রচারণা পর্যটন এলাকার পরিবেশ ও সামাজিক মূল্যবোধের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলেও মত দিয়েছেন অনেকে।

বিষয়টি পুলিশের নজরে আসার পর রাঙামাটি কোতোয়ালি থানার পক্ষ থেকে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়। পরে পর্যটন করপোরেশনের ম্যানেজার আলোক বিকাশ চাকমা লোকজন দিয়ে সাইনবোর্ডগুলো খুলে ফেলেন।

এইচ এম এন্টারপ্রাইজের দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যানেজার পাপন বণিক বলেন, পর্যটন করপোরেশন থেকে তারা বারটি লিজ নিয়েছেন। তবে আশানুরূপ বিক্রি না হওয়ায় গ্রাহকদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছিল।

তার দাবি, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অনুমতি নিয়েই সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে। তবে পর্যটন করপোরেশনের কাছ থেকে এ বিষয়ে কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি বলেও তিনি স্বীকার করেন।

পাপন বণিক বলেন, “আমরা সরকারকে ট্যাক্স দিই এবং বাংলাদেশে উৎপাদিত সার্টিফায়েড কেরু মদ লাইসেন্সের আওতায় বিক্রি করি। পর্যটন এলাকায় আমাদের একটি বার রয়েছে; এ বিষয়টি পর্যটকদের জানাতেই সাইনবোর্ড দেওয়া হয়েছিল।”

তবে ম্যানেজারের এই দাবিকে সরাসরি নাকচ করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।

রাঙামাটির মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) নাহিদ হাসান সৌরভ মুঠোফোনে বলেন, “আমরা এ ধরনের কোনো অনুমতি দিইনি। এ বিষয়ে আমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনাও হয়নি। যারা এটি করেছে, তারা অপরাধ করেছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

রাঙামাটি পর্যটন করপোরেশনের ম্যানেজার আলোক বিকাশ চাকমা প্রতিবেদক আলমগীর মানিককে বলেন, “আমি দীর্ঘদিন ধরে এখানে দায়িত্ব পালন করছি। পর্যটন করপোরেশনের পক্ষ থেকে এ ধরনের কর্মকাণ্ড কখনো করা হয়নি। লিজ নেওয়া প্রতিষ্ঠানটি নিয়মবহির্ভূতভাবে সাইনবোর্ড টাঙিয়েছে।”

এদিকে প্রকাশ্য স্থানে মদের বিজ্ঞাপন প্রদর্শনের বিষয়টি নিয়ে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে। একটি লাইসেন্সধারী বার পরিচালনার অনুমতি থাকলেই কি জনসম্মুখে মদ বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়ার অনুমতি পাওয়া যায়? সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন ছাড়া এমন প্রচারণা চালালে তার বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া যায়? আর পর্যটন করপোরেশনের জায়গা ব্যবহার করে কোনো লিজগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান নিয়মবহির্ভূত বিজ্ঞাপন দিলে তার দায়ভার কার?

বিষয়টি নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে রাঙামাটি পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আব্দুর রকিব-পিপিএম প্রতিবেদক আলমগীর মানিককে জানান,“এ ধরনের সাইনবোর্ড ঝোলানো পুরোপুরি আইনবহির্ভূত। এতে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয় এবং বিষয়টি মোটেও ভালো কিছু নয়।”

সচেতন নাগরিকরা বলছেন, রাঙামাটির মতো একটি পর্যটন শহরের সৌন্দর্য, পারিবারিক পরিবেশ ও পর্যটনবান্ধব ভাবমূর্তি রক্ষায় জনসম্মুখে মদ বিক্রির প্রচারণার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। তাদের মতে, প্রকাশ্য স্থানে মদের বিজ্ঞাপন সহজে কিশোর ও উঠতি বয়সী তরুণদের নজরে আসতে পারে। এতে মদ্যপানের প্রতি আগ্রহ বা সামাজিকভাবে এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে পর্যটন এলাকায় পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা মানুষের মধ্যেও অস্বস্তি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তাদের আরও আশঙ্কা, কোনো নিয়ন্ত্রণ বা যথাযথ নজরদারি ছাড়া মদ বিক্রির প্রচারণা বাড়তে থাকলে পর্যটনকেন্দ্রিক এলাকার স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত হতে পারে এবং এর সুযোগ নিয়ে অবৈধ মাদক ব্যবসা বা অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডও উৎসাহিত হতে পারে। তবে এসব আশঙ্কা বাস্তবে কতটা প্রভাব ফেলছে, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত নজরদারি ও তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন প্রয়োজন।

সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে অনুমতির প্রশ্নটি। প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার যেখানে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অনুমতির দাবি করেছেন, সেখানে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর বলছে, তারা কোনো অনুমতিই দেয়নি। ফলে সাইনবোর্ড টাঙানোর আগে কোনো লিখিত অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না এবং থাকলে সেই অনুমোদনের বৈধতা কী; তা খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পুলিশের নজরে আসার পর সাইনবোর্ডগুলো খুলে ফেলা হলেও ঘটনাটি ইতোমধ্যে রাঙামাটির পর্যটন, আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক পরিবেশ নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল কি না, সেটিও তদন্তের দাবি রাখে।

সচেতন মহলের দাবি, শুধু সাইনবোর্ড খুলে ফেললেই বিষয়টির সমাধান হবে না। কার অনুমতিতে, কোন বিধির আওতায় এবং কী উদ্দেশ্যে জনসম্মুখে এমন বিজ্ঞাপন টাঙানো হয়েছিল; তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। পাশাপাশি ভবিষ্যতে পর্যটন এলাকায় এ ধরনের বিজ্ঞাপন যাতে জনসম্মুখে প্রদর্শিত না হয়, সে বিষয়ে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়েছেন তারা।