এডিপি’র প্রকল্পে অধিকাংশ কাজ দুই নাম্বারি; ভাগাভাগি করলে দোষের কি!


নুরুল কবির    |    ১২:২১ এএম, ২০২১-০৭-০২

এডিপি’র প্রকল্পে অধিকাংশ কাজ দুই নাম্বারি; ভাগাভাগি করলে দোষের কি!

বান্দরবানের রুমায় এডিপি “বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচী'র” একটি প্রকল্পের টাকা উপজেলা চেয়ারম্যানের নাম ভাঙ্গিয়ে হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ অভিযোগটি উপজেলা পরিষদের সাঁট মুদ্রাক্ষরিক কাম-কম্পিউটার অপারেটর পদে কর্মরত উসাইমং মারমার বিরুদ্ধে। গত বুধবার (৩০ জুন) বিকালে বিষয়টি জানতে চাইলে উসাইমং মারমা বলেন এডিপি"র অধিকাংশ প্রকল্পের সবকাজ দুই নাম্বারি। এতে ভাগাভাগি করে নিলে দোষের কি! সব পার্সেন্টেজ টাকা তো আমার হাতেই জমা হয়। উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউএনও এবং ইঞ্জিনিয়ার সবার কাছে তো আমার হাত থেকে পার্সেন্টেজ ভাগ হয়। কোথায় কি হয় আমিই জানি। আপনার যা করবেন-করেন। আমার যায়-আসে না। স্থানীয় সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে এমন অহমিকা দম্ভোক্তির কথা জানিয়েছেন বান্দরবানের রুমা উপজেলা পরিষদের সাঁট মুদ্রাক্ষরিক কাম-কম্পিউটার অপারেটর পদে কর্মরত তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী উসাইমং মারমা। 

উপজেলা চেয়ারম্যানের গোপনীয় দাপ্তরিক কাজে সহকারি বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারী হিসেবে তাঁকে সিএ (কনফিডেন্টসিয়াল এ্যাসিস্টেন্টস্) বলে ডাকা হয়। তাই উসাইমং মারমাকে সবাই সিএ বলে ডাকে ও চিনে। সিএ উসাইমং মারমার এহেন দম্ভোক্তি আচরণ ও পরিষদের উচ্চ পদস্থ কর্তাদের নাম ভাঙ্গিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার সাহসের পিছনে তাঁর খুঁটি জোর কোথায় তা নিয়েও চা’দোকান থেকে অফিস পাড়া পর্যন্ত আলোচনা-সমালোচনার ঝর ওঠেছে। এ ঘটনায় সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকেও সুশীল সমাজে অসন্তোষ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে সরবে। 

জানাগেছে,২০২০-২০২১ অর্থসালে উপজেলা পরিষদের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীর আওতায় প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিব (পিআইসি) র মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য ২০টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। তার মধ্যে মেনরন পাড়া স্কুলের যাওয়ার রাস্তায় ছোট ঝিরিতে গেট ওয়ালের  অসমাপ্ত কাজ সমাপ্তি করণ একটি প্রকল্প। এর বিপরীতে মোট বরাদ্ধ এক লক্ষ ৩০ হাজার টাকা।

এ প্রকল্পে বাস্তবায়ন কমিটি সভাপতি করা হয়- রেমাক্রীপ্রাংসা ইউনিয়নের দুর্গম এলাকার ৭নং ওয়ার্ডের সদস্য সাকসিম ম্রোকে। এ সদস্য সহজ সরল মনকে পুঁজি করে ফন্ডি আঁটে উপজেলা পরিষদের  সিএ উসাইমং মারমা। তিনি মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে ওই ইউপি সদস্যকে বলেছেন গৃহিত প্রকল্পটি উপজেলা চেয়ারম্যানের। সবকাজ উপজেলা চেয়ারম্যান করবেন। এ প্রকল্পের সভাপতি হিসেবে বিলে স্বাক্ষর মূল্য বাবদ তিন হাজার টাকা দেবে উপজেলা চেয়ারম্যান। এতে মৌন সম্মতি দেন ইউপি সদস্য সাকসিম ম্রো। 

এদিকে সাকসিম ম্রো বলেছেন-উপজেলা চেয়ারম্যান আমাকে সভাপতি করে প্রকল্প দিয়ে কাজ করতে বলে দেয়ার পর চেয়ারম্যানের সাথে আর কথা বলার সুযোগ হয়নি। শুধু উপজেলা চিএ উচাইমং সাথে কথা কইছে (অর্থাৎ-উপজেলা সিএ উসাইমং মারমার সাথে কথা হয়েছে)। সব বিল নেয়ার পর সভাপতি হিসেবে আমাকে মোট সাত হাজার টাকা দিয়েছেন। বাদবাকি সিএ উসাইমং মারমা হাতে তুলে দিতে বিভিন্নভাবে কায়দা করে হাতিয়ে নিয়ে ফেলে। ইউপি সদস্য সাকসিম ম্রো আরো বলেন সিএ উসাইমং গাড়ি রিজার্ভ করে ১৫ ব্যাগ সিমেন্ট ও ৬০০টির মতো ইট নিয়ে কাজের স্থানে এসেছিল। তবে তখন বালু দেখি নাই, পরে কিভাবে করছে আমি আর কিছু জানি না, সব উসাইমং জানেন বলে জানিয়েছেন সাক্সিম ম্রো। 

বিষয়টি জানতে চাওয়া হলে সিএ উসাইমং মারমা বলেন, মেম্বারের সাথে স্থানীয় লোকজনের মনোমালিন্য থাকায় প্রকল্পটির কাজ করতে সমস্যা আছে। উসাইমং মারমার ভাষ্যমতে, মেম্বার দ্বারা কাজ করা যাবে না, একথা জানার পর সিএ উসাইমং মেম্বারকে এ পরামর্শ দেন, কাজটি উপজেলা চেয়ারম্যানের বলতে বলছি। একাজে প্রতারণা করে চেয়ারম্যানের নাম ভাঙ্গিয়ে প্রকল্প টাকা ভাগিয়ে নেয়ার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিরক্তবোধ হয়ে ওঠেন। পরে আবার স্বীকার করে সিএ উসাইমং বলেন মোটমাট  কাজ করতে ৫০ হাজার টাকা বেশি খরচ হয়েছে। তারমধ্যে ১৭%টাকা উপজেলা পরিষদের দিতে হয়েছে। বাকী টাকায় কাজ করে লাভাংশ সাকসিম মেম্বার ও আমি(উসাইমং)১৫ হাজার করে ভাগ কর নিয়েছি, বলেন উসাইমং মারমা। তবে সভাপতি হিসেবে স্বাক্ষরের মূল্য সাত হাজার টাকা দেয়ার পর আর কোনো টাকা দেয়নি বলে জানিয়েছেন ইউপি সদস্য সাকসিম ম্রো।

উপজেলা চেয়ারম্যান উহ্লাচিং মারমা বলেছেন আমার সিএ উসাইমং মারমাকে এ কাজে কোনো দায়িত্ব দেয়া হয়নি। মেম্বার সাকসিম ম্রোকে কাজটি করতে বলেছি। লাভ হলে সেই হবে। এ ব্যাপারে সাকসিমের কথা বলে সত্যতা যাচাই করে দেখা হবে। 

উপজেলা প্রকৌশলী মোহাম্মদ তোফায়েল আহমেদ বলেন সিএ উসাইমং সবাইকে জড়িয়ে পার্সেন্টেসের কথা কোনো ভিত্তি নেই। কাজ করলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা করবেন, সরকারি কর্মচারী সিএ কেন উপজেলা চেয়ারম্যান নাম ভাঙ্গিয়ে কাজ করবে(?) প্রশ্ন তুলেন এবং তিনি আরো বলেন সিএ উসাইমং মারমা অফিসের কাজও তেমন করেনা। নানা জায়গায় এখানে-ওখানে ঘুরে থাকে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ ইয়ামিন হোসেন  বলেন  প্রকল্প সভাপতি জনপ্রতিনিধিদেরকে করা হয়ে থাকে। কোনো কাজ না হলে প্রথমে সভাপতিদের তলব করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। সিএ অন্যায় কিছু করলে প্রথমে উপজেলা চেয়ারম্যান দেখবে। তবে কোনো সরকারি কর্মচারী এসব কাজে জড়িত হবার কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ^াসও দিয়েছেন তিনি।