বৈসাবি’ নয়—নিজস্ব স্বকীয়তায় উৎসব পালনের আহ্বান পার্বত্য মন্ত্রীর


আলমগীর মানিক    |    ১১:৩০ পিএম, ২০২৬-০৪-০৯

বৈসাবি’ নয়—নিজস্ব স্বকীয়তায় উৎসব পালনের আহ্বান পার্বত্য মন্ত্রীর

বাংলাদেশ সচিবালয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ প্রেস ব্রিফিংয়ে পার্বত্য অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী সামাজিক উৎসবসমূহকে নিজ নিজ সম্প্রদায়ের স্বতন্ত্র নাম ও রীতিতে পালনের আহ্বান জানিয়েছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান এমপি।

বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু, বিষু, চাংক্রান ও চাংলান উপলক্ষ্যে আয়োজিত এই ব্রিফিংয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব কৃষ্টি ও সংস্কৃতি বাংলাদেশের জাতীয় ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

তিনি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন, এখন থেকে আর ‘বৈসাবি’ নামে সম্মিলিতভাবে এই উৎসব উদযাপন করা হবে না; বরং প্রত্যেক সম্প্রদায় তাদের নিজস্ব স্বকীয় নাম ও রীতিতেই উৎসব পালন করবে।

মন্ত্রী বলেন, ‘বৈসাবি’ নামটি মূলত তিনটি সম্প্রদায়ের নামের আদ্যক্ষর—ত্রিপুরাদের বৈসু, মারমাদের সাংগ্রাই এবং চাকমাদের বিজু—থেকে এসেছে।

কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে মোট ১১টি সম্প্রদায় রয়েছে, তাই এই নামের মাধ্যমে অন্য সম্প্রদায়গুলোর স্বতন্ত্র পরিচয় উপেক্ষিত হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তার মতে, অতীতে এই নামকরণ অন্যান্য জাতিসত্ত্বাকে অবমূল্যায়নের শামিল ছিল।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের সকল জাতিসত্ত্বার স্বকীয়তা রক্ষার বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে প্রত্যেক সম্প্রদায় তাদের নিজস্ব নামেই এই উৎসব পালন করবে এবং সকলকে সমান সম্মান দেওয়া হবে।

মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান জানান, আগামী ১২ এপ্রিল রাজধানীতে বসবাসরত পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে নিয়ে একটি বর্ণাঢ্য আয়োজন করা হবে, যেখানে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নিজস্ব উৎসবের নাম ও রীতিকে সামনে আনা হবে।

তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য হলো বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়ে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা। কোনো ধরনের বৈষম্য আমরা চাই না।”

উৎসবের সময়সূচি তুলে ধরে তিনি বলেন, ১২ এপ্রিল (২৯ চৈত্র) পালিত হবে ‘ফুল বিজু’, যা মূলত শ্রদ্ধা ও প্রার্থনার দিন।

এদিন ফুলকে সম্মান জানিয়ে পানিতে অর্পণ করা হয়, ভাসিয়ে দেওয়া নয়। ১৩ এপ্রিল (৩০ চৈত্র), অর্থাৎ বাংলা বছরের শেষ দিনে পালিত হবে মূল বিজু। এদিন নতুন পোশাক পরিধান, সালামি প্রদান এবং মিলনমেলার আয়োজন করা হয়।

১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখে উৎসবের সমাপনী পর্ব অনুষ্ঠিত হবে। এদিন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষ খিয়াং-এ গিয়ে প্রার্থনায় অংশ নেন এবং মারমা সম্প্রদায় জলকেলি উৎসবে মেতে ওঠে।

এই উৎসবের মাধ্যমে আশীর্বাদ গ্রহণ করে নতুন বছরকে বরণ করা হয়। মন্ত্রী বলেন, “এই উৎসব শুধু পাহাড়িদের নয়, এটি পাহাড়ি-বাঙালি সকলের মিলনের উৎসব।”

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন এমপি। তিনি বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চান, আমাদের সব উৎসব রংধনুর মতো বহুরঙে রঙিন হোক।

প্রতিটি সম্প্রদায়ের স্বকীয়তা ফুটে উঠুক—এটাই স্বাভাবিক এবং কাম্য।” তিনি আরও বলেন, এই উৎসবগুলো কেবল বিনোদন নয়, বরং জনগণের শেকড় ও পরিচয়ের প্রতিফলন।

আগামী ১২ এপ্রিল রাজধানীর বেইলি রোডস্থ পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্স থেকে রমনা পার্কের লেক পর্যন্ত একটি বর্ণাঢ্য র‍্যালি ও পুষ্প অর্পণ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে এই উৎসবমুখর পদযাত্রা শুরু হবে বলে জানানো হয়।

মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই প্রেস ব্রিফিংয়ে আরও উপস্থিত ছিলেন বান্দরবান পার্বত্য জেলার সংসদ সদস্য সাচিং প্রু, মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা।

এই ঘোষণার মাধ্যমে পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব পরিচয় ও সংস্কৃতিকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।