পুলিশ সংস্কার: কাঠামোগত সংকট থেকে আস্থার পুনর্গঠন


আলমগীর মানিক    |    ১০:২৮ পিএম, ২০২৬-০৫-১১

পুলিশ সংস্কার: কাঠামোগত সংকট থেকে আস্থার পুনর্গঠন

আলমগীর মানিক

 

বাংলাদেশে পুলিশকে ঘিরে জনমনে দীর্ঘদিনের এক ধরনের দ্বৈত ধারণা কাজ করে। একদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তাদের অপরিহার্য ভূমিকা, অন্যদিকে দুর্নীতি, হয়রানি ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ। সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতায় প্রায়ই উঠে আসে “ম্যানেজ” সংস্কৃতির কথা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সংস্কৃতির পেছনে শুধু ব্যক্তিগত অনৈতিকতা দায়ী, নাকি এর গভীরে রয়েছে রাষ্ট্রীয় কাঠামোগত ব্যর্থতা?


বাস্তবতা বলছে, সমস্যার বড় অংশই প্রাতিষ্ঠানিক। খুন বা ডাকাতির মতো গুরুতর মামলার তদন্তে একজন তদন্ত কর্মকর্তার জন্য বরাদ্দ মাত্র ছয় হাজার টাকা। অথচ একটি মামলার তদন্ত শেষ হতে বছরের পর বছর লেগে যায়, তদন্ত কর্মকর্তাও একাধিকবার বদলি হন। এত অল্প অর্থে কয়েকবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতেই বরাদ্দ শেষ হয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। আরও বিস্ময়কর হলো, অর্থ পাচারের মতো জটিল মামলার তদন্ত ব্যয় ধরা হয়েছে মাত্র তিন হাজার টাকা। হাজার কোটি টাকার আর্থিক অপরাধ উদ্ঘাটনের জন্য এই বরাদ্দ কার্যত উপহাসের সামিল।


শুধু তদন্ত নয়, আদালতে যাতায়াত, সাক্ষ্য প্রদান কিংবা মামলাসংক্রান্ত অন্যান্য খরচও অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ সদস্যদের নিজেদের পকেট থেকে বহন করতে হয়। একজন কনস্টেবল, এএসআই বা এসআই; যাদের বেতন সীমিত'' তাদের কাছে এটি এক ধরনের অমানবিক প্রত্যাশা। রাষ্ট্র যখন দায়িত্ব পালনের ন্যূনতম ব্যয়ও নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তখন অনৈতিক অর্থসংস্থানের পথ তৈরি হয়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান অবশ্যই জরুরি, তবে সেই সঙ্গে দুর্নীতির জন্ম দেয় এমন বাস্তবতাও পরিবর্তন করতে হবে।


পুলিশ সদস্যদের কর্মপরিবেশও উদ্বেগজনক। প্রতিদিন ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে নেই সাপ্তাহিক ছুটি, নেই ওভারটাইমের নিশ্চয়তা। অন্যান্য সরকারি চাকরিজীবীরা যেখানে নির্ধারিত কর্মঘণ্টা ও ছুটির সুবিধা পান, সেখানে পুলিশ সদস্যদের জীবন প্রায় অবিরাম দায়িত্বের চক্রে আবদ্ধ।

জরুরি সেবার প্রকৃতির কারণে অতিরিক্ত দায়িত্ব হয়তো অনিবার্য, কিন্তু তার ন্যায্য প্রতিদান নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের সদস্যদের জন্য স্বাস্থ্যকর খাবার, বিশ্রাম ও মানবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।


তবে শুধু আর্থিক ও প্রশাসনিক সংস্কারই যথেষ্ট নয়। পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এখনও অনেক মানুষ বিপদে পড়েও থানায় যেতে ভয় পান। এই ভয় দূর করতে হলে পুলিশকে জনগণের সেবক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে, ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে নয়।


এই জায়গায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি আসে পেশাগত স্বাধীনতা নিয়ে। পুলিশকে আইনানুগ নির্দেশ পালন করতেই হবে; এটাই শৃঙ্খলার ভিত্তি। কিন্তু বেআইনি নির্দেশ মানার কোনো বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে না। বাস্তবে প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক মহল কিংবা কখনও জনপ্রতিনিধিরাও পুলিশের ওপর বেআইনি চাপ প্রয়োগ করেন। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। পুলিশ সদস্যদের এমন আইনি সুরক্ষা দিতে হবে, যাতে তারা অন্যায় নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করতে পারেন এবং তার জন্য কোনো প্রতিশোধ বা হয়রানির শিকার না হন।


একই সঙ্গে পদায়ন ও পদোন্নতিতে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তি নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক আনুগত্য বা প্রভাবনির্ভর প্রশাসনিক সংস্কৃতি কখনোই একটি পেশাদার বাহিনী গড়ে তুলতে পারে না। পেশাগত মর্যাদা ও স্বাধীনতা ছাড়া জনগণের আস্থা অর্জনও সম্ভব নয়।


সবশেষে প্রশ্ন থেকে যায় ! রাষ্ট্র যদি পুলিশকে প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা, বাজেট ও আইনি সুরক্ষা দিতে প্রস্তুত থাকে, তবে পুলিশ বাহিনী নিজেও কি সেই পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় সমানভাবে প্রস্তুত? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের পুলিশ ব্যবস্থা জনগণের আস্থার প্রতীক হবে, নাকি পুরোনো সংকটের পুনরাবৃত্তি ঘটবে!!!