পার্বত্য বাঙালিদের আয়কর অব্যাহতি, মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিতের দাবিতে বিক্ষোভ


নিজস্ব প্রতিবেদক    |    ১২:৫৯ এএম, ২০২৬-০৮-০৫

পার্বত্য বাঙালিদের আয়কর অব্যাহতি, মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিতের দাবিতে বিক্ষোভ

পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাসরত বাঙালিদের জন্য আয়কর অব্যাহতি, মেধাভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থা চালু, সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত এবং পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাস দমনের দাবিতে রাজধানীর শাহবাগে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১০টায় শাহবাগের শহীদ হাদী চত্বরে সার্বভৌমত্ব সুরক্ষা পরিষদ-এর উদ্যোগে এ বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ শেষে অংশগ্রহণকারীরা শহীদ হাদী চত্বর থেকে রাজু ভাস্কর্য পর্যন্ত একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন।

সমাবেশে সার্বভৌমত্ব সুরক্ষা পরিষদের প্রধান সমন্বয়ক মো. মোস্তফা আল ইহযায-এর সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক আশরাফ আলী আকন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল খন্দকার ফরিদুল আকবর, পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ লিগ্যাল এইডের সভাপতি অ্যাডভোকেট পারভেজ তালুকদার, শ্রমিক নেতা বজলুর রহমান বাবলু, ছাত্রনেতা মিজানুর রহমান, স্টুডেন্ট ফর সভারেন্টির আহ্বায়ক জিয়া উল হক, শাহিদুল ইসলাম, কৃষিবিদ রফিকুল ইসলাম, প্রভাষক নারগিস জুই, যুব নেতা সেলিম রেজা বাচ্চু, শাহপরান সাইম, রোজিনা আক্তারতারেক রহমান শাওনসহ আরও অনেকে।

আয়কর অব্যাহতির দাবি

সভাপতির বক্তব্যে মো. মোস্তফা আল ইহযায বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনগণ আয়কর অব্যাহতির সুবিধা ভোগ করলেও একই এলাকায় বসবাসকারী বাঙালিরা সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এতে একই ভৌগোলিক এলাকায় বসবাসকারী নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

তিনি বলেন, ১৯৮৪ সালের আয়কর অধ্যাদেশ এবং পরবর্তীতে আয়কর আইন, ২০২৩-এ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য কর অব্যাহতির বিধান বহাল রাখা হয়েছে। এমনকি চলতি বছরের অর্থবিল নিয়ে আলোচনার পরও তাদের বেতন আয়ের করমুক্ত সুবিধা বহাল রাখার বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু একই অঞ্চলের স্থায়ী বাঙালি বাসিন্দারা সেই সুবিধা পাচ্ছেন না, যা অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় তাদের পিছিয়ে দিচ্ছে।

মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও সমঅধিকারের দাবি

মোস্তফা আল ইহযায আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫০ দশমিক ০৬ শতাংশ স্থানীয় বাঙালি হলেও চাকরি, উচ্চশিক্ষা, উন্নয়ন প্রকল্প এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধায় তারা প্রত্যাশিত অংশীদারিত্ব থেকে বঞ্চিত। তিনি দাবি করেন, পার্বত্য অঞ্চলে সকল নাগরিকের জন্য সমান সাংবিধানিক অধিকার ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, আয়কর অব্যাহতির কারণে কিছু সুবিধাভোগী ঠিকাদার কম দরপত্র জমা দিতে সক্ষম হন, ফলে বাঙালি ঠিকাদাররা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।

জেলা পরিষদে স্বচ্ছ নিয়োগের আহ্বান

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অ্যাডভোকেট পারভেজ তালুকদার বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা পরিষদে হস্তান্তরিত বিভাগগুলোর ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির (১১–২০তম গ্রেড) পদে শতভাগ স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি উচ্চশিক্ষায় পার্বত্য বাঙালি শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক কোটা চালুর দাবিও জানান তিনি।

জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে বক্তব্য

প্রধান অতিথি অধ্যাপক আশরাফ আলী আকন বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের কিছু জনগোষ্ঠীর ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের দাবির পেছনে ভূ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বিভিন্ন ধারায় ‘উপজাতি’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে এবং এ বিষয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি জাতীয় স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি দেশের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।

সমাবেশ থেকে উত্থাপিত প্রধান দাবিগুলো

  • পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী বাঙালিদের আয়কর অব্যাহতির আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা।
  • সকল সরকারি চাকরিতে স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করা।
  • পার্বত্য বাঙালি শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষায় পৃথক কোটা চালু করা।
  • পার্বত্য অঞ্চলে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাস দমনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।
  • পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক অধিকার সমভাবে নিশ্চিত করা।

সমাবেশ শেষে অংশগ্রহণকারীরা শাহবাগের শহীদ হাদী চত্বর থেকে রাজু ভাস্কর্য পর্যন্ত বিক্ষোভ মিছিল করেন এবং তাদের দাবিগুলো দ্রুত বাস্তবায়নে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।