যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে নির্যাতন, স্বামী চিজিমুনি চাকমার ৩ বছরের কারাদণ্ড


আলমগীর মানিক    |    ০১:৪৮ এএম, ২০২৬-০৯-০৪

যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে নির্যাতন, স্বামী চিজিমুনি চাকমার ৩ বছরের কারাদণ্ড

আলমগীর মানিক

যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে মারধর ও শারীরিক নির্যাতনের মামলায় রাঙামাটিতে চিজিমুনি চাকমা নামের এক ব্যক্তিকে তিন বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন রাঙামাটির নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল এর বিচারক। একই সঙ্গে তাকে এক লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার বিকেলে রাঙামাটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক এ রায় ঘোষণা করেন। তবে রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন না; তিনি পলাতক রয়েছেন বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) অ্যাডভোকেট মাকসুদা হক।

দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি হলেন বাঘাইছড়ি উপজেলার বড়আদাম এলাকার চিজিমুনি চাকমা (৫০)। তিনি মামলার বাদী....চাকমার স্বামী।

মামলার নথি ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য থেকে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে আসামি মাদকাসক্ত ছিলেন এবং সংসারের খরচ বহন না করে বিভিন্ন সময় স্ত্রীকে নির্যাতন করতেন বলে অভিযোগ করা হয়। মাদক সেবনের জন্য স্ত্রীর কাছে টাকা দাবি এবং টাকা না দিলে মারধরের ঘটনাও ঘটত বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৭ সালের আগস্টের মাঝামাঝি এক রাতে মদ্যপ অবস্থায় আসামি স্ত্রীর কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে মারধর করা হয়। পরে বিষয়টি স্থানীয় কার্বারী আদালতে জানানো হলে সেখানেও স্ত্রীকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী পরবর্তীতে রাঙামাটিতে আইন সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠান ব্লাস্টের সহযোগিতা নেন।

মামলার নথিতে আরও বলা হয়, ২০১৮ সালের ১৫ এপ্রিল সকাল ১১টার দিকে বাঘাইছড়ির বড়আদামে বাদীনির পৈত্রিক বাড়িতে আসামি মাতাল অবস্থায় গিয়ে স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের গালিগালাজ করেন। এ সময় তিনি দায়ের করা মামলা তুলে নেওয়া এবং বসতভিটা বিক্রি করে টাকা দেওয়ার জন্য চাপ দেন।

বাদীনির অভিযোগ, আসামি তাকে ৫০ হাজার টাকা যৌতুক দেওয়ার দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে একপর্যায়ে তিনি স্ত্রীর ওপর হামলা চালিয়ে বুক ও পিঠে কিল-ঘুষি মারেন এবং ঘর থেকে বের করে দেন। এতে বাদীনির শরীরের বিভিন্ন স্থানে কালশিটে ও ফুলে যাওয়াসহ গুরুতর আঘাত লাগে।

পরে পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে বাঘাইছড়ি থানায় নিয়ে যান। সেখানে বিষয়টি স্বামী-স্ত্রীর পারিবারিক বিরোধ হিসেবে স্থানীয়ভাবে মীমাংসার পরামর্শ দেওয়া হয় বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এরপর রাঙামাটিতে এসে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ২০১৮ সালের ১৬ এপ্রিল রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেন বাদীনি।

পরবর্তীতে ব্লাস্টের রাঙামাটি ইউনিটের সহায়তায় তিনি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন। মামলায় কয়েকজনকে সাক্ষী করা হয়, যারা ঘটনার বিষয়ে আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

রাষ্ট্রপক্ষের পিপি অ্যাডভোকেট মাকসুদা হক বলেন, এই রায়ের মাধ্যমে ভুক্তভোগী নারী ন্যায়বিচার পেয়েছেন। পাশাপাশি পাহাড়ি সমাজে এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে একটি ইতিবাচক বার্তা যাবে।

তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি সমাজব্যবস্থায় নারী নির্যাতন ও যৌতুকের মতো ঘটনা ঘটলেও সামাজিক চাপ, পারিবারিক সমঝোতা এবং নানা কারণে অনেক ঘটনা আদালত পর্যন্ত পৌঁছায় না। ফলে অনেক ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন। এ ধরনের রায় নারীদের আইনি প্রতিকার নেওয়ার ক্ষেত্রে সাহস জোগাবে।

আইনজীবীরা বলছেন, পারিবারিক বিরোধের নামে নারী নির্যাতনকে সামাজিকভাবে প্রশ্রয় না দিয়ে আইনি প্রতিকার নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে যৌতুকের দাবি, শারীরিক নির্যাতন ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনায় ভুক্তভোগীদের পাশে পরিবার, স্থানীয় সমাজ ও আইন সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।