আপিল বিভাগের আদেশ গোপন! পাহাড়ের ১৯ ইটভাটাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা


আলমগীর মানিক    |    ০৩:২০ এএম, ২০২৬-০৮-০৬

আপিল বিভাগের আদেশ গোপন! পাহাড়ের ১৯ ইটভাটাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা

আলমগীর মানিক

আপিল বিভাগের স্থগিতাদেশ গোপন রেখে হাইকোর্ট থেকে নিষেধাজ্ঞার আদেশ (ইনজাংশন) বর্ধিত করায় খাগড়াছড়ি জেলা ইটভাটা মালিক সমিতিকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে রিটটি খারিজ (রুল ডিসচার্জ) করে জরিমানার অর্থ সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারের কাছে জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

বৃহস্পতিবার হাইকোর্টের বিচারপতি রাজিক আল জলিল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

আদালত সূত্রে জানা যায়, খাগড়াছড়ি জেলার ১৯টি ইটভাটার মালিকদের পক্ষে খাগড়াছড়ি জেলা ইটভাটা মালিক সমিতি একটি রিট আবেদন দায়ের করে। ওই আবেদনের প্রেক্ষিতে গত ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ হাইকোর্ট রুল জারি করেন এবং ছয় মাসের জন্য সরকারের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার আদেশ দেন।

পরবর্তীতে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিবের পক্ষে ওই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করা হলে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত গত ৫ মার্চ ২০২৬ হাইকোর্টের দেওয়া নিষেধাজ্ঞার আদেশ স্থগিত করেন।

তবে আপিল বিভাগের ওই স্থগিতাদেশ কার্যকর থাকা অবস্থায় গত ৬ জুলাই ২০২৬ খাগড়াছড়ি জেলা ইটভাটা মালিক সমিতি পুনরায় হাইকোর্টে নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করে। আবেদনের সময় আপিল বিভাগের স্থগিতাদেশের বিষয়টি আদালতের সামনে উপস্থাপন করা হয়নি। ফলে হাইকোর্ট নিষেধাজ্ঞার আদেশ বর্ধিত করেন।

তিন পার্বত্য জেলায় অবৈধ ইটভাটা উচ্ছেদে জনস্বার্থে দায়ের করা একাধিক মামলার আইনজীবী সিনিয়র অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বিষয়টি আদালতের নজরে আনেন। তিনি আদালতকে জানান, আপিল বিভাগের আদেশ গোপন রেখে হাইকোর্ট থেকে আদেশ নেওয়া হয়েছে, যা আদালতের সঙ্গে প্রতারণার শামিল।

তার আবেদনের পর বিষয়টি কজলিস্টে অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানিতে মনজিল মোরসেদ আদালতের কাছে রিট আবেদনকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানান।

অন্যদিকে, রিট আবেদনকারীদের পক্ষে অ্যাডভোকেট পারভেজ হোসেন আদালতকে জানান, তিনি আপিল বিভাগের আদেশ সম্পর্কে অবগত ছিলেন না এবং তিনি আর মামলাটি পরিচালনা করতে চান না।

শুনানি শেষে আদালত খাগড়াছড়ি জেলা ইটভাটা মালিক সমিতির রিট আবেদনকারীদের বিরুদ্ধে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা আরোপ করেন। একই সঙ্গে জরিমানার অর্থ সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারের কাছে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন।

এছাড়া আদালত রুল ডিসচার্জ (খারিজ) করে আদেশের অনুলিপি সংশ্লিষ্ট সকল বিবাদীর কাছে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন বলে প্রতিবেদককে নিশ্চিত করেছেন সিনিয়র আইনজীবি এ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ। 

পার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধ ইটভাটা পরিচালনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই পরিবেশবাদী সংগঠন, মানবাধিকার সংস্থা এবং স্থানীয় বাসিন্দারা উদ্বেগ জানিয়ে আসছেন। অভিযোগ রয়েছে, পাহাড় কেটে মাটি সংগ্রহ, বনাঞ্চল ধ্বংস এবং কৃষিজমির উপর চাপ সৃষ্টি করে অনেক ইটভাটা পরিচালিত হচ্ছে। 

পরিবেশবাদীদের মতে, পার্বত্য অঞ্চলের ভঙ্গুর প্রতিবেশ ব্যবস্থায় অপরিকল্পিত ইটভাটা শুধু পরিবেশের জন্য নয়, স্থানীয় জনগণের জীবন-জীবিকা ও জীববৈচিত্র্যের জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিত ও অবৈধ ইটভাটা পরিচালনার ফলে; পাহাড় ও টিলা কেটে মাটি সংগ্রহের কারণে ভূমিধসের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। বন উজাড় ও গাছ কাটার ফলে জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

কৃষিজমির উর্বর মাটি নষ্ট হয়ে খাদ্য উৎপাদন কমে যায়। কয়লা, কাঠ ও নিম্নমানের জ্বালানি পোড়ানোর ফলে বায়ুদূষণ বেড়ে যায় এবং কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধি পায়। ইটভাটার ধোঁয়া শিশু, বয়স্ক ও শ্বাসকষ্টের রোগীদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করে। ধুলাবালির কারণে আশপাশের ফসল, ফলের বাগান ও জলাশয়ের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়ন, অবৈধ ইটভাটা বন্ধ এবং পরিবেশবান্ধব ব্লক বা বিকল্প নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হলে পার্বত্য অঞ্চলের পরিবেশ রক্ষায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।