দেশের প্রতি ১০ শিশুর ৪ জনের রক্তে অনিরাপদ মাত্রায় সিসা, সচেতনতায় ইয়ুথনেট-ভিবিডির মানববন্ধন


অহিদুল ইসলাম অভি    |    ১১:৩৫ পিএম, ২০২৬-১০-৩১

দেশের প্রতি ১০ শিশুর ৪ জনের রক্তে অনিরাপদ মাত্রায় সিসা, সচেতনতায় ইয়ুথনেট-ভিবিডির মানববন্ধন

সিসাদূষণের উৎস, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে চট্টগ্রামে মানববন্ধন ও র‍্যালি অনুষ্ঠিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সিসাদূষণ প্রতিরোধ সপ্তাহ-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।

শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সকাল ১১টায় ইয়ুথনেট গ্লোবাল ও ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশের উদ্যোগে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এতে স্থানীয় প্রতিনিধি, সুশীল সমাজের সদস্য, যুব প্রতিনিধি, সাংবাদিক ও স্বেচ্ছাসেবীরা অংশ নেন।

‘সিসাদূষণ প্রতিরোধে, আমরা আছি একসঙ্গে’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত সপ্তাহব্যাপী এই সচেতনতামূলক কর্মসূচি দেশের আট বিভাগে পরিচালিত হচ্ছে। পিওর আর্থ বাংলাদেশের সহযোগিতায় ইয়ুথনেট গ্লোবাল কর্মসূচিটি বাস্তবায়ন করছে। এতে সহ-আয়োজক হিসেবে রয়েছে ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশ, ইউক্যান ও আর্থ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন।

আয়োজকদের লক্ষ্য, সিসার ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে শিক্ষার্থী, তরুণ, শিক্ষক, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সচেতন করা। পাশাপাশি দূষণের উৎস শনাক্ত, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে সিসাদূষণ মোকাবিলায় তরুণদের সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জাতীয় সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৩৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ শিশুর রক্তে সিসার মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি। অর্থাৎ, প্রতি ১০ শিশুর মধ্যে প্রায় চারজনের রক্তে অনিরাপদ মাত্রায় সিসার উপস্থিতি রয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ গর্ভবতী নারী সিসার বিষক্রিয়ার শিকার।

সিসার সংস্পর্শে এলে শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ, শেখার ক্ষমতা, স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে হৃদরোগ ও কিডনির জটিলতাসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

ব্যবহৃত সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারির অনিরাপদ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ সিসাদূষণের অন্যতম প্রধান উৎস। এ ছাড়া সিসাযুক্ত রং, খেলনা, রান্নার বাসনপত্র ও প্রসাধনসামগ্রী থেকেও মানুষের শরীরে সিসা প্রবেশের ঝুঁকি রয়েছে।

পিওর আর্থ বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মিতালী দাশ বলেন, শিশুদের সিসার বিষক্রিয়া থেকে রক্ষা করতে দূষণের উৎস শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নিরাপদ ভোগ্যপণ্য নিশ্চিত করা, পরিবেশসম্মত ব্যাটারি পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ এবং জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।

তিনি জানান, এ লক্ষ্যে পিওর আর্থ পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে সম্প্রসারিত উৎপাদক দায়বদ্ধতা (ইপিআর) নির্দেশিকা প্রণয়নে কাজ করছে। এর মাধ্যমে লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির কার্যকর সংগ্রহ, নজরদারি ও পরিবেশসম্মত পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণে সহায়তা পাওয়া যাবে।

ইয়ুথনেট গ্লোবালের নির্বাহী সমন্বয়ক সোহানুর রহমান বলেন, অপরিকল্পিত ও অনিরাপদ সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারি পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শুধু শ্রমিকদের নয়, আশপাশের জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য ও পরিবেশকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। ক্ষতিকর শিল্পপ্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা এবং এ বিষয়ে নীতিগত পরিবর্তনের দাবি জোরদার করার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।

ইয়ুথনেট গ্লোবালের চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় সমন্বয়কারী মো. আয়মান উর রহমান বলেন, সিসাদূষণ একটি নীরব জনস্বাস্থ্যঝুঁকি। এর প্রভাব বিশেষ করে গর্ভবতী নারী ও শিশুদের জন্য মারাত্মক হতে পারে। এ ঝুঁকি মোকাবিলায় পরিবার, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও তরুণদের সম্মিলিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন। সচেতনতা বৃদ্ধি ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমে মা ও শিশুদের সিসার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।

উল্লেখ্য, সিসামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সরকার ২০২৬ থেকে ২০৩৫ মেয়াদের জাতীয় কৌশল ও বহু-বছরভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা অনুমোদন করেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ৯৫ শতাংশ শিশুর রক্তে সিসার মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মাত্রার নিচে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

মানববন্ধন শেষে অংশগ্রহণকারীরা র‍্যালি বের করেন। পরে সিসাদূষণের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও প্রতিরোধের উপায় তুলে ধরে লিফলেট বিতরণের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শেষ হয়।