অপারেশন ক্লিন হার্ট নয়, আইনের নির্মোহ প্রয়োগই হোক সন্ত্রাস দমনের পথ

অতীত ভুলের পুনরাবৃত্তি হলে সবচেয়ে বড় সংকটে পড়বে বিএনপি নিজেই

আলমগীর মানিক    |    ১২:৩৮ এএম, ২০২৬-১০-০৫

অপারেশন ক্লিন হার্ট নয়, আইনের নির্মোহ প্রয়োগই হোক সন্ত্রাস দমনের পথ

আলমগীর মানিক

দেশে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও দলীয় আধিপত্য বিস্তার নিয়ন্ত্রণে ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এর আদলে নতুন কোনো বিশেষ অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে! বিভিন্ন মাধ্যমে এমন আলোচনা শোনা যাচ্ছে। যদিও এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্তের বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়, তবুও এমন সম্ভাবনার আলোচনা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে।

সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে সরকার কঠোর হবে; এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক প্রত্যাশা। কিন্তু সেই কঠোরতার নামে যদি আবারও বিতর্কিত কোনো বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়, তাহলে তার পরিণতি কী হতে পারে, তা ভাবার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

বিশেষ করে বিএনপির জন্য বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। কারণ, অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, বিশেষ অভিযানের নামে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রয়োগ কখনো কখনো অপরাধ দমনের সীমা ছাড়িয়ে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ভারসাম্যকে ভয়াবহভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

২০০২ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে পরিচালিত ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ আজও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বিতর্কিত অধ্যায়। সন্ত্রাস দমনের উদ্দেশ্যে শুরু হওয়া ওই অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা, হেফাজতে মৃত্যু এবং পরবর্তী সময়ে দায়মুক্তির আইন নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সেই অভিযানের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অভিঘাতও বিএনপির জন্য সুখকর ছিল না।

অভিযানের নামে যদি আবারও নির্বিচার গ্রেপ্তার, নির্যাতন কিংবা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটে, তাহলে তার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে বর্তমান সরকারকেই।

প্রশ্ন হচ্ছে, যারা এমন অভিযান পরিচালনা করবেন, তাদের প্রত্যেকের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা, পেশাদারিত্ব এবং সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা কী? রাষ্ট্রীয় বাহিনীর প্রতিটি সদস্য যে সরকারের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক স্বার্থের প্রতি সংবেদনশীল থাকবেন, এমন নিশ্চয়তা দেওয়ার সুযোগ নেই। বরং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর দায়িত্ব সরকারের দলীয় স্বার্থ রক্ষা করা নয়; সংবিধান ও আইনের প্রতি অনুগত থেকে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

কিন্তু বাস্তবতার জায়গাটি হলো, কোনো বিশেষ অভিযানের নামে যদি মাঠপর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের হাতে ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়, তাহলে সেই ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানোর কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। 
এখানেই বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সতর্কবার্তা রয়েছে।

বিএনপি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগ্রাম, ত্যাগ ও সাংগঠনিক শক্তির মধ্য দিয়ে আজকের অবস্থানে এসেছে। কিন্তু বিশেষ অভিযানের নামে যদি দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা নির্বিচার হয়রানি, গ্রেপ্তার কিংবা সহিংসতার শিকার হন, তাহলে দলটি আবারও সাংগঠনিক সংকটে পড়তে পারে। অতীতে যে ধরনের পরিস্থিতি বিএনপির তৃণমূলকে দুর্বল করেছিল, তার পুনরাবৃত্তি হলে দলটির সাংগঠনিক ভিত্তি আরও নড়বড়ে হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

আরও উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপপ্রয়োগ শুধু একটি রাজনৈতিক দলকে দুর্বল করে না; এটি সামগ্রিকভাবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

বিশেষ অভিযানের নামে যদি রাজনৈতিক কর্মীদের হত্যা, গুম, নির্যাতন কিংবা পরিকল্পিতভাবে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাহলে তার পরিণতি কেবল বর্তমান সরকারকে ঘিরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। রাষ্ট্রের ভেতরে অস্থিরতা, প্রশাসনিক ভারসাম্যহীনতা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতি থেকে ভবিষ্যতে নতুন কোনো রাজনৈতিক সংকট কিংবা এক-এগারোর মতো অস্বাভাবিক পরিস্থিতির পথ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

অবশ্যই সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও দলীয় পরিচয়ে অপরাধ করার বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান থাকা জরুরি। কোনো রাজনৈতিক পরিচয় অপরাধের ঢাল হতে পারে না। বিএনপির নাম ব্যবহার করে কেউ চাঁদাবাজি করলে, দখলবাজি করলে কিংবা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। এখানে কোনো ছাড়ের সুযোগ নেই।

তবে সেই ব্যবস্থা হতে হবে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগের মাধ্যমে। অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধের প্রমাণই হবে বিচারের ভিত্তি।

মনে রাখতে হবে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব কোনো বিশেষ অভিযাননির্ভর হতে পারে না। অপরাধ দমনের জন্য প্রচলিত আইন, বিচারব্যবস্থা, তদন্তপ্রক্রিয়া এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাদারিত্বই যথেষ্ট হওয়ার কথা। প্রয়োজন শুধু আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা।

সরকার যদি সত্যিকার অর্থেই সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে চায়, তাহলে প্রথমেই দলীয় পরিচয়ে অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া বন্ধ করতে হবে। অপরাধী যে দলেরই হোক, যে পদেই থাকুক, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিশ্চিত করতে হবে, তারা কোনো রাজনৈতিক দলের হয়ে নয়, রাষ্ট্র ও জনগণের হয়ে দায়িত্ব পালন করছেন।

বিএনপির জন্যও এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শিক্ষা রয়েছে। দলের নাম ভাঙিয়ে যারা অপরাধ করছে, তাদের বিরুদ্ধে দলীয়ভাবেই কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় অপরাধীদের দায় পুরো দলকে বহন করতে হবে। সরকারের জন্যও একই কথা প্রযোজ্য; দলীয় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার নামে রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে বিতর্কিত পথে পরিচালিত করা কোনোভাবেই সমাধান হতে পারে না।

অপারেশন ক্লিন হার্টের মতো বিতর্কিত কর্মসূচি অতীতে কী ধরনের রাজনৈতিক ও মানবিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল, তা ভুলে যাওয়ার সুযোগ নেই। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি সব সময় একইভাবে ঘটে না, কিন্তু ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিলে একই ধরনের ভুল নতুন নামে ফিরে আসতে পারে।

আজ বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু ক্ষমতায় থাকা নয়; বরং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ধরে রাখা। সেই আস্থা ধরে রাখতে হলে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে, কিন্তু সেই কঠোরতা হতে হবে আইনের সীমার মধ্যে।

কারণ, সন্ত্রাস দমনের নামে যদি আবারও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপপ্রয়োগ শুরু হয়, তাহলে অপরাধী দমনের পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং রাষ্ট্রীয় সংকটই বড় হয়ে উঠতে পারে।

সরকারের মনে রাখা উচিত, সন্ত্রাস দমনে অভিযান সাময়িক ফল দিতে পারে, কিন্তু আইনের শাসনই পারে স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে। অপারেশন ক্লিন হার্টের পুনরাবৃত্তি নয়, বরং অপরাধীর পরিচয় নির্বিশেষে আইনের নির্মোহ প্রয়োগই হোক বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক দৃঢ়তার প্রকৃত পরীক্ষা।

অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি করে বিএনপিকে আবারও সাংগঠনিক সংকটের দিকে ঠেলে দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। বরং যে দল গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের কথা বলে ক্ষমতায় এসেছে, তাদের কাছ থেকেই জনগণ প্রত্যাশা করে রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচারই হবে প্রধান নীতি।