রামগড়ে ভূমি অধিগ্রহণে শতকোটি টাকার জালিয়াতি; মেয়রসহ ৩৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা


নিজস্ব প্রতিবেদক    |    ১০:০২ পিএম, ২০২৩-১০-০১

রামগড়ে ভূমি অধিগ্রহণে শতকোটি টাকার জালিয়াতি; মেয়রসহ ৩৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা

আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতা মিলেমিশে নিজেদের নামে বন্দোবস্ত দেখিয়ে ভূমি অধিগ্রহণ করে শতকোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর দীর্ঘ তদন্ত শেষে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় খাগড়াছড়ির রামগড় পৌরসভার বর্তমান ও সাবেক মেয়র, জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা, উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ ৩৬ জনের নামে মামলা হয়েছে। জেলা প্রশাসকের (ডিসি) নির্দেশে উপজেলা ভূমি অফিসের অফিস সহকারী কবির আহাম্মদ গত বুধবার রাতে এসব মামলা করেন। জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ছয়টি ভুয়া হোল্ডিং দেখিয়ে পৌর এলাকায় সরকারি খাস খতিয়ানের প্রায় ২৬ একর ভূমি অধিগ্রহণের অভিযোগে ছয়টি মামলা করা হয়।

এর আগে গত বছরের ৬ ডিসেম্বর একটি জাতীয় দৈনিকে ‘রামগড়ে ভূমি অধিগ্রহণে নজিরবিহীন জালিয়াতি’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত থাকায় ভূমি বিভাগের তিন কর্মচারীকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তাছাড়া অন্য তিনজনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। 

ছয়টি মামলার আসামিরা হলেন-রামগড় পৌরসভার রোলার চালক নুরুল ইসলাম, সাবেক জেলা পরিষদের সদস্য ও সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা ভুবন মোহন ত্রিপুরা, খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি হাফেজ আহমেদ ভূঁইয়া, তার ভাই আহাম্মদ করিম, ভাতিজা দলিল লেখক মোস্তফা ভূঁইয়া, রামগড় পৌরসভার সাবেক মেয়র ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহজাহান কাজী রিপন, তার ছয় ভাই ও এক বোন-কাজী রফিকুল ইসলাম মিন্টু, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা কাজী জিয়াউল হক শিপন, কাজী হারুন অর রশিদ, কাজী ফাতেমা বেগম, কাজী সেলিম, কাজী সাইফুল ইসলাম, কাজী শাহরিয়ার ইসলাম।

এ ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন বর্তমান মেয়র রফিকুল আলম কামাল, তার ভাই শফিকুল আলম, মমিনুল আলম, মনিরুল আলম, বিএনপি নেতা নুরনবী চৌধুরী, কামিনী রঞ্জন ত্রিপুরা, ছবুরা খাতুন, মোহাম্মদ আব্দুল জলিল, ফেরদৌস ইসলাম, পারভীন আক্তার, সাজেদা খাতুন, দিলীপ চন্দর রক্ষিত, স্নেহকান্তি চাকমা, অবনী লাল ত্রিপুরা, হাসিনা আক্তার, নুরজাহান বেগম, রোকেয়া বেগম, মো. নুরুন্নবী, জাহানার বেগম, নাজমা বেগম, রাশেদা বেগম, আছমা বেগম, মামুন হোসেন ও জোবেদা আক্তার মুন্নী। তাদের মধ্যে নুরুল ইসলাম, মোস্তফা ভূঁইয়া ও ছবুরা খাতুন তিনটি এবং ফেরদৌস ইসলাম ও নুরনবী চৌধুরী দুটি মামলার আসামি।

রামগড় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, তদন্ত করে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

যুগান্তরে প্রকাশিত সংবাদের সূত্র ধরে মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়, রামগড়ে বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সেতু নির্মাণপরবর্তী স্থলবন্দরের জন্য বারইয়ারহাট-হেয়াকো-রামগড় সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের শতকোটি টাকা আত্মসাতের চেষ্টা করা হয়। এ নিয়ে কয়েক মাস তদন্ত চালায় খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসন। এ প্রকল্পে খাগড়াছড়ির সোনাইপুল থেকে রামগড় বাজার পর্যন্ত অধিগ্রহণ করা ১৭ একরের মধ্যে ১৩ একর জমিই জাল দলিল করে আত্মসাতের চেষ্টার প্রমাণ পায় প্রশাসন। সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং জনসাধারণের এসব অধিগ্রহণ করা ভূমি আত্মসাতের চেষ্টা চালায় সেভেন স্টার নামের একটি চক্র।

অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, স্থলবন্দরের জন্য সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্প বারইয়ারহাট-হেয়াকো-রামগড় সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পে অধিগ্রহণের সরকারি কয়েক কোটি টাকা আত্মসাতের লক্ষ্যে বিবাদীরা রামগড় ভূমি কার্যালয়ের অসাধু কর্মচারী, জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের মহাফেজখানা শাখার অসাধু কর্মচারীদের এবং ২২৯ নম্বর মৌজার হেডম্যানের যোগসাজশে ২২৯ নম্বর রামগড় মৌজায় সরকারি ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত জায়গায় দুর্নীতি ও জাল জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া হোল্ডিং নম্বর-৮৮৭ তেরি করে। চক্রটি ২০২১ সালের জুন থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে এ জালিয়াতি করে। এলাকায় জনসাধারণের অভিযোগ এবং সংবাদ মাধ্যমে (যুগান্তর) সেই খবর প্রকাশের পর জেলা প্রশাসনের নজরে এলে তদন্তে এ জালিয়াতির প্রমাণ মেলে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ফারুকুর রহমানের বেশ কিছু জমি তারা জালিয়াতির মাধ্যমে নেওয়ার চেষ্টা করে। তিনি বলেন, জালিয়াত চক্রের অনেকে ১৯৮০ সালের পর শরণার্থী হিসাবে বিভিন্ন এলাকা থেকে রামগড়ে আসেন। তাদের কারও কোনো দলিলপত্র রেকর্ডে নেই। এমনকি তাদের পূর্বপুরুষেরও ওই এলাকা বা আশপাশে জমির মালিকানা নেই। সর্বশেষ ২০২১ সাল পর্যন্ত কোনো দলিলে এসব ভূমির মালিকানার কোনো অস্তিত্ব নেই।

তবু ভূমি অধিগ্রহণের টাকা লোপাট করতে ভূমি অফিসের কানুনগো দেলোয়ার, সার্ভেয়ার জাহাঙ্গীর ও দলিল লেখক মোস্তফা, পৌরসভার রোলার চালক নুরুল ইসলামের সহায়তায় ভুয়া দাগ ও পর্চায় অন্তর্ভুক্ত করে দলিল বানিয়ে সরকারি সিএনবি জায়গা ও ভুয়া জমির মালিকানা সেজে অর্থ লোপাটের চেষ্টা করে। তিনি শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ভূমিদস্যু চক্র তাদের হীন স্বার্থ জায়েজ করতে উচ্চ আদালতে রিট করেছে। তিনি জেলা প্রশাসনের কাছে আহ্বান জানান, অবিলম্বে পুরো চক্রকে আইনের আওতায় এনে ভূমির মালিকদের প্রকৃত জায়গা বুঝিয়ে দিতে।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ডেপুটি রেভিনিউ কালেক্টর ও ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা এবং তদন্ত কমিটির প্রধান মনজুরুল আলম বলেন, রামগড় মৌজার ১ নম্বর সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত ভূমিতে অসংখ্য ভুয়া হোল্ডিং সৃষ্টি এবং অধিগ্রহণভুক্ত করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তদন্ত কমিটি দীর্ঘ তদন্ত শেষে ছয়টি ভুয়া হোল্ডিং বাতিল করার সুপারিশ করে। এর ভিত্তিতে জেলা প্রশাসকের নির্দেশে ১৪ সেপ্টেম্বর তিনি উপজেলা সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) ছয়টি ভুয়া হোল্ডিং এবং সংশ্লিষ্ট রেকর্ড জরুরি ভিত্তিতে বাতিল করার নির্দেশ দেন।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. সহিদুজ্জামান বলেন, রামগড় ভূমি অফিস, রেকর্ড শাখা ও জেলা কানুনগোর ছয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে জেলা প্রশাসকের আওতাধীন তিনজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। অপর তিনজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিভাগীয় কমিশনার ও ভূমি মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। মৌজাপ্রধানকে অপসারণ ও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পার্বত্য শাসনবিধি অনুযায়ী মং সার্কেল চিফকে (রাজা) চিঠি দেওয়া হয়েছে।  সূত্র: দৈনিক যুগান্তর।