বাঘাইছড়ির দুর্গম পাহাড়ি গ্রামে পানির জন্য হাহাকার


ওমর ফারুক সুমন    |    ১০:৫৫ পিএম, ২০২৬-০৪-২১

বাঘাইছড়ির দুর্গম পাহাড়ি গ্রামে পানির জন্য হাহাকার

রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের শতাধিক গ্রামে দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট।

ঝিরি, ঝরনা ও ছড়া শুকিয়ে যাওয়ায় প্রায় ৩০ হাজারের বেশি মানুষ বর্তমানে চরম দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

দীর্ঘদিন ধরে এসব প্রাকৃতিক উৎসের পানির ওপর নির্ভরশীল পাহাড়ি জনগোষ্ঠী এখন পানির জন্য হাহাকার করছেন।

স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা সদরের আশপাশের জীবতলী, কচুছড়ি, ৪ কিলো নোয়া আদাম, মুসলিম ব্লক, প্রশিক্ষণ টিলা বাঙালী পাড়া, সাজেকসহ বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় এই সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে।

আগে এসব এলাকার মানুষ ঝিরি-ঝরনা থেকেই সারা বছরের পানির চাহিদা পূরণ করলেও বর্তমানে অধিকাংশ প্রাকৃতিক জলাধার শুকিয়ে গেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিকল্পিত জুম চাষ ও নির্বিচারে বন উজাড়ের ফলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

পাহাড়ের গাছপালা কেটে ফেলার কারণে বৃষ্টিপাত কমে গেছে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। ফলে ঝিরি-ঝরনা ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাচ্ছে।

সাম্প্রতিক সরেজমিনে দেখা গেছে, সাজেক ইউনিয়নের ৯ নম্বর পাড়া, ৮ নম্বর পাড়া শিয়ালদাই, হাচ্ছেপাড়া, অরুনপাড়া ও লংকরসহ বিভিন্ন গ্রামে পানির জন্য চরম দুর্ভোগ বিরাজ করছে।

এসব গ্রামে ৩০ থেকে ৫০টি পরিবারের বসবাস। পাহাড়ি ভূমির বিস্তীর্ণ এলাকায় জুম চাষের কারণে আশপাশের পাহাড় প্রায় বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ভুজন ত্রিপুরা ও লক্ষ্মীবালা চাকমা জানান, “গত বছর এই সময় কোনো পানির সংকট ছিল না। কিন্তু চলতি বছরের মার্চের শেষ দিক থেকে পানি সংকট শুরু হয়েছে।

আগে আশপাশের ছড়াগুলোতে সারা বছর পানি পাওয়া যেত। এখন জুম চাষ বেড়ে যাওয়ায় এবং বন উজাড়ের কারণে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।”

পানির সংকট এতটাই তীব্র যে অনেক সময় দুই থেকে তিন কিলোমিটার দূরে গিয়েও পানি পাওয়া যাচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করলেও পানির অভাবে অনেক পরিবার গ্রাম ছাড়ার কথা ভাবছেন।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এসব পাহাড়ি গ্রাম সমতল এলাকা থেকে এক থেকে দুই হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত হওয়ায় এখানে নলকূপ বা রিংওয়েল স্থাপন করা সম্ভব নয়। ফলে প্রাকৃতিক জলধারাই ছিল একমাত্র পানির উৎস।

সাজেক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অতুলাল চাকমা বলেন, “আগের মতো এখন আর পাহাড়ি ঝরনায় পানি নেই। ফলে পানির সংকট দিন দিন বাড়ছে।”

উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী রুশো খিশা জানান, “এসব দুর্গম এলাকায় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হলে দাতা সংস্থার সহায়তা প্রয়োজন।

আগে এখানে ঘন বন ছিল, কিন্তু এখন বন উজাড় হয়ে যাওয়ায় পানির স্তর কমে গেছে।”

বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা মারজান বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, “অপরিকল্পিত জুম চাষ ও বন উজাড়ের কারণে এবং বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় পাহাড়ি এলাকায় পানির সংকট দেখা দিয়েছে।

তবে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।”

স্থানীয়দের দাবি, এই সংকট নিরসনে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে পাহাড়ি অঞ্চলে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।