থানচির দুর্গম পাহাড়ি গ্রামে হাম-রুবেলার ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব, আক্রান্ত অন্তত ৮৪ শিশু


বান্দরবান প্রতিনিধি    |    ০৮:০৩ পিএম, ২০২৬-০৫-১৭

থানচির দুর্গম পাহাড়ি গ্রামে হাম-রুবেলার ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব, আক্রান্ত অন্তত ৮৪ শিশু

বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি উপজেলা থানচির রেমাক্রী ইউনিয়নের একাধিক প্রত্যন্ত গ্রামে ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়েছে হাম-রুবেলা রোগ।

এখন পর্যন্ত অন্তত ৮৪ জন স্কুলপড়ুয়া শিশু আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আক্রান্তদের মধ্যে রয়েছে লিটক্রে ম্রো পাড়া, সূর্যমনি ত্রিপুরা পাড়া, ছোট ইয়াংব পাড়া, বড় ইয়াংব পাড়া, রেনি ম্রো পাড়া ও মানযা ম্রো পাড়াসহ আশপাশের আরও কয়েকটি গ্রামের শিক্ষার্থীরা।

দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় দ্রুত রোগ ছড়িয়ে পড়ায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।

রেমাক্রী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুইশৈথুই মারমা রনি বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, আক্রান্তদের অধিকাংশই শিশু ও কিশোর শিক্ষার্থী।

খবর পাওয়ার পরপরই স্বাস্থ্য বিভাগ জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। রোববার (১৭ মে) ভোরে থানচি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে একটি বিশেষ মেডিকেল টিম ইঞ্জিন বোটযোগে দুর্গম আক্রান্ত এলাকায় পাঠানো হয়।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মোহাম্মদ হাসিবুল জানান, হাম-রুবেলা ছাড়াও জ্বর, ডায়রিয়া, ম্যালেরিয়া, নিউমোনিয়া ও সর্দি-কাশির প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে পাঁচ সদস্যের দলটি আক্রান্ত এলাকায় পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে।

উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার ঋতুপর্ণা চাকমা এবং সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক জ্যোতিপ্রিয় চাকমার নেতৃত্বে পরিচালিত এই মেডিকেল টিম জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে কাজ করবে।

স্থানীয় ওয়ার্ড সদস্য মাংচং ম্রো জানান, পাশ্ববর্তী আলীকদম উপজেলার কুরুপপাতা এলাকা থেকে কয়েকজন শিক্ষার্থী ছুটিতে নিজ বাড়িতে ফেরার পর অল্প সময়ের মধ্যেই রোগটি বিভিন্ন গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে।

আক্রান্ত শিশুদের শরীরে জ্বর, লাল ফুসকুড়ি, দুর্বলতা এবং অন্যান্য উপসর্গ দেখা দিয়েছে। দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি আরও জানান, মিয়ানমার সীমান্তবর্তী লিটক্রে এলাকা থানচি সদর থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত।

সেখানে পৌঁছানোর একমাত্র মাধ্যম সাংগু নদীপথ। ইঞ্জিন বোটে যাত্রা করতে প্রায় দুই দিন সময় লাগে।

ফলে আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সেখানে অস্থায়ী চিকিৎসা ক্যাম্প স্থাপন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

এদিকে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. ওয়াহিদুজ্জামান মুরাদ জানান, কয়েকদিন আগে থানচি সদরের আশার আলো ও থানচি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে পাঁচজন শিশু ও নারী হাসপাতালে ভর্তি হন।

তাদের মধ্যে একজন ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থীও ছিল। চিকিৎসা শেষে তারা সুস্থ হয়ে রোববার দুপুরে হাসপাতাল ত্যাগ করেছেন।

তিনি বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বয়ে জরুরি পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

আক্রান্ত এলাকায় অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপন, টিকাদান কার্যক্রম জোরদার এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে। সমন্বয় সম্পন্ন হলেই দ্রুত কার্যক্রম শুরু করা হবে।

স্বাস্থ্য বিভাগ অভিভাবকদের শিশুদের সময়মতো হাম-রুবেলা টিকা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।

একই সঙ্গে আক্রান্ত শিশুদের অন্যদের থেকে আলাদা রাখা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে এই রোগের বিস্তার ঠেকাতে দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।