কাপ্তাই হ্রদে ভাসমান অবস্থায় বিরল “বার্কিং ডিয়ার” উদ্ধার 


আলমগীর মানিক    |    ০৭:১৬ পিএম, ২০২৬-০৫-২২

কাপ্তাই হ্রদে ভাসমান অবস্থায় বিরল “বার্কিং ডিয়ার” উদ্ধার 

আলমগীর মানিক

রাঙামাটির লংগদু উপজেলাধীন কাপ্তাই হ্রদে ভাসমান অবস্থায় একটি মৃত হরিণ উদ্ধার হওয়ায় স্থানীয়দের মাঝে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। শুক্রবার বিকেলে দ্বীপ কাট্টলী বাজার সংলগ্ন হ্রদের পানিতে হরিণটিকে ভাসতে দেখেন স্থানীয় বাসিন্দা মুহাম্মদ আব্দুর রশিদ।

স্থানীয় ব্যবসায়ী মিজান জানান, হরিণটি পানিতে ভাসতে দেখার পরপরই বিষয়টি স্থানীয়দের অবহিত করা হয়। পরে এলাকাবাসী মৃত হরিণটিকে পানি থেকে উদ্ধার করে বাজার কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পুলিশ ক্যাম্পের পাশেই মাটি চাপা দেন।

স্থানীয়দের ধারণা, শিকারি কিংবা কোনো হিংস্র প্রাণীর আক্রমণ থেকে প্রাণ বাঁচাতে হরিণটি হ্রদে ঝাঁপ দিয়েছিল। পরে পানিতে দীর্ঘসময় থাকার কারণে স্ট্রোক বা শারীরিক দুর্বলতায় প্রাণ হারাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

প্রযুক্তির সহায়তায় জানা গেছে, উদ্ধার হওয়া প্রাণীটি ভারতীয় মুন্টজ্যাক বা “বার্কিং ডিয়ার” প্রজাতির হরিণের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। বাংলায় এটি “কাকর হরিণ” নামেও পরিচিত। এর বৈজ্ঞানিক নাম “মুন্টিয়াকাস মুন্টজাক”।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বার্কিং ডিয়ার আকারে তুলনামূলক ছোট এবং সাধারণত লালচে-বাদামি বা হালকা খয়েরি রঙের হয়ে থাকে। পুরুষ হরিণের ছোট শিং দেখা যায়। বিপদের আভাস পেলে এরা কুকুরের ঘেউ-ঘেউয়ের মতো শব্দ করে, এ কারণেই এদের “বার্কিং ডিয়ার” বলা হয়।

এই প্রজাতির হরিণ সাধারণত বনাঞ্চল, ঝোপঝাড় ও পাহাড়ি এলাকায় বিচরণ করে। বাংলাদেশসহ ভারত, নেপাল ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এদের বিস্তৃতি রয়েছে। ঘাস, পাতা, ফল ও কচি ডালপালা এদের প্রধান খাদ্য।

প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বার্কিং ডিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বনজ উদ্ভিদের বীজ ছড়িয়ে বনাঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে এরা। তবে বন উজাড় ও অবৈধ শিকারের কারণে বর্তমানে অনেক এলাকায় এদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের পাহাড়ি বনাঞ্চলে একসময় নিয়মিত দেখা মিলত হরিণজাতীয় নানা বন্যপ্রাণীর। তবে বন উজাড়, অবৈধ শিকার এবং মানুষের আগ্রাসনের কারণে দিন দিন কমে যাচ্ছে এসব প্রাণীর উপস্থিতি। সম্প্রতি রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদে একটি মৃত “বার্কিং ডিয়ার” বা কাকর হরিণ উদ্ধারের ঘটনায় আবারও সামনে এসেছে পাহাড়ি অঞ্চলের বন্যপ্রাণী সংকটের বিষয়টি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ি বনাঞ্চল হরিণজাতীয় প্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল হলেও বর্তমানে সেই পরিবেশ দ্রুত ধ্বংস হচ্ছে। পাহাড় কাটা, জুম চাষের বিস্তার, বনভূমি উজাড় এবং বসতি সম্প্রসারণের কারণে বন্যপ্রাণীরা তাদের স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্র হারাচ্ছে। ফলে খাদ্য ও নিরাপদ আশ্রয়ের সংকটে পড়ে অনেক প্রাণী লোকালয়ে চলে আসছে কিংবা শিকারিদের হাতে প্রাণ হারাচ্ছে।

বিশেষ করে Muntiacus muntjak বা বার্কিং ডিয়ার প্রজাতির হরিণ একসময় পার্বত্য চট্টগ্রামের বনাঞ্চলে দেখা গেলেও এখন তা অনেকটাই বিরল হয়ে পড়েছে। লাজুক স্বভাবের এ প্রাণীগুলো সাধারণত ঘন বন ও ঝোপঝাড়ে বিচরণ করে। বিপদের আভাস পেলেই দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পাহাড়ি অঞ্চলে অবৈধ শিকার এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। অনেক সময় ফাঁদ পেতে কিংবা দেশীয় অস্ত্র ব্যবহার করে বন্যপ্রাণী শিকার করা হয়। এছাড়া বনাঞ্চলে মানুষের অতিরিক্ত যাতায়াত ও শব্দদূষণও প্রাণীদের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত করছে।

পরিবেশবিদরা বলছেন, পাহাড়ি জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে অনেক বন্যপ্রাণী সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। এজন্য বন সংরক্ষণ, অবৈধ শিকার বন্ধ এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।