নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে” রাবিপ্রবি'র প্রকল্প পরিচালক আব্দুল গফুর


আলমগীর মানিক    |    ০২:৫৮ এএম, ২০২৬-০৫-২৮

নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে” রাবিপ্রবি'র প্রকল্প পরিচালক আব্দুল গফুর

আলমগীর মানিক

রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রাবিপ্রবি) স্থাপন প্রকল্প নিয়ে সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত “১৬৮ কোটি টাকার প্রকল্পে নয়-ছয়” শীর্ষক সংবাদের বিরুদ্ধে বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আব্দুল গফুরসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

তাদের দাবি, প্রকল্প সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য আংশিক ও বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যার ফলে জনমনে ভুল ধারণার সৃষ্টি হয়েছে।

প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে শুরু হওয়া বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্পের প্রাথমিক বরাদ্দ ছিল ১১৬ কোটি ৪৭ লাখ টাকা।

পরে প্রথম সংশোধনীতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৪৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকা এবং বর্তমানে দ্বিতীয় সংশোধনী অনুযায়ী প্রকল্পের মোট বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা। অ

থচ বিভিন্ন প্রতিবেদনে “১৬৮ কোটি টাকার প্রকল্প” উল্লেখ করে প্রকৃত তথ্য বিকৃত করা হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

তাদের দাবি, দীর্ঘ ১৩ বছরে প্রকল্পে মোট ব্যয় হয়েছে মাত্র ৮৯ কোটি ৯৪ লাখ টাকা এবং অবশিষ্ট অর্থ এখনো ছাড় কিংবা ব্যয় করা হয়নি।

ফলে “সম্পূর্ণ অর্থ লোপাট” বা “নয়-ছয়” জাতীয় অভিযোগ বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

প্রকল্পের ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায়, এ পর্যন্ত চারজন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রথম প্রকল্প পরিচালক ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক প্রফেসর মো. সেকান্দর আলী খান।

পার্বত্য অঞ্চলের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও জটিল পরিস্থিতির কারণে তিনি কয়েক মাসের মধ্যেই দায়িত্ব ছেড়ে দেন। পরবর্তীতে প্রায় এক দশক দায়িত্ব পালন করেন প্রফেসর ড. প্রদানেন্দু বিকাশ চাকমা।

তাঁর সময়কালে মোট ৬৮ কোটি ৭৬ লাখ ১৭ হাজার টাকা ব্যয় হয়, যার মধ্যে প্রায় ৬৫ কোটি টাকা ভূমি অধিগ্রহণে ব্যয় করা হয়েছে। এছাড়া প্রকল্প পরিচালকের গাড়ি ক্রয়ে ব্যয় হয় প্রায় ৭০ লাখ টাকা।

তৃতীয় প্রকল্প পরিচালক প্রফেসর ড. সেলিনা আখতারের দায়িত্বকালে ব্যয় হয় ৮ কোটি ৬৯ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আব্দুল গফুর।

তিনি জানান, তাঁর দায়িত্বকালীন সময়ে প্রায় ১৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ১০ কোটি টাকা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরকে প্রদান করা হয়েছে।

অবশিষ্ট অর্থ দিয়ে অভ্যন্তরীণ সড়ক উন্নয়ন, গ্যারেজ নির্মাণ, ভূমি উন্নয়ন, মাস্টার প্ল্যান, গেইট ও নেইমপ্লেট নির্মাণ, অফিস পরিচালনা, বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ক্রয় এবং পরিকল্পিত বনায়নের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।

“৬৮ লাখ টাকা অগ্রিম গ্রহণ” প্রসঙ্গে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সরকারি আর্থিক বিধি অনুযায়ী প্রশাসনিক ও প্রকল্প-সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অগ্রিম গ্রহণ করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে বিল-ভাউচার, ট্যাক্স ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিলের মাধ্যমে তা নিয়ম অনুযায়ী সমন্বয় করা হয়েছে।

প্রতিটি অগ্রিম বিল ভাইস চ্যান্সেলরের অনুমোদনক্রমে এবং সরকারি বিধিমালা অনুসরণ করেই গ্রহণ ও ব্যয় করা হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।

“বাইরে প্রিন্টিং” সংক্রান্ত অভিযোগের জবাবে কর্মকর্তারা বলেন, মাস্টার প্ল্যান, ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রইং এবং বড় আকারের নকশা সাধারণ অফিস প্রিন্টার বা ফটোকপি মেশিনে করা সম্ভব ছিল না।

এজন্য বিশেষায়িত প্রযুক্তির সহায়তায় চট্টগ্রাম থেকে প্রয়োজনীয় প্রিন্ট ও কপি করাতে হয়েছে। একইভাবে প্রকল্প পরিচালকের গাড়ির অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহারের অভিযোগও অস্বীকার করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, গাড়িটি কেবল প্রকল্প পরিচালকের ব্যক্তিগত কাজে নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম, অতিথি পরিবহন, উন্নয়নকাজ তদারকি এবং বিভিন্ন দাপ্তরিক সফরে ব্যবহৃত হয়েছে।

এমনকি ভাইস চ্যান্সেলরের সরকারি গাড়ি বিকল হয়ে পড়লে দীর্ঘ সময় প্রকল্প পরিচালকের গাড়ি প্রশাসনিক কাজে ব্যবহার করা হয় বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া শেলটেক কনসালটেন্ট ফার্ম, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি), শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আগত বিশেষজ্ঞদের সভা, সাইট পরিদর্শন ও কারিগরি কার্যক্রমে অংশগ্রহণের জন্য সরকারি নিয়ম অনুযায়ী আপ্যায়ন, যাতায়াত, সম্মানী ও আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব ব্যয় প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বাভাবিক প্রশাসনিক ব্যয়ের অংশ এবং এখানে ব্যক্তিগত সুবিধা গ্রহণের কোনো সুযোগ নেই।

“কাজ শুরুর আগেই বিল পরিশোধ” সংক্রান্ত অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ।

তাদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের গেইট ও নেইমপ্লেট নির্মাণের জন্য উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ঠিকাদার নির্বাচন করা হয় এবং প্রকৌশলীদের যাচাই-বাছাই শেষে কাজের অগ্রগতির ভিত্তিতে ধাপে ধাপে বিল পরিশোধ করা হয়েছে।

বর্তমান প্রকল্প পরিচালক আব্দুল গফুর তাঁর যোগ্যতা নিয়ে উত্থাপিত প্রশ্নের জবাবে বলেন, তাঁর প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় ২২ বছরেরও বেশি বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে।

এছাড়া পিপিআর, টেন্ডার ব্যবস্থাপনা, আইবাস, পিএমআইএস ও ই-পিএএমআইএসসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে তাঁর পেশাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।

পরিবেশ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগের বিষয়ে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতির জন্য যথাযথ আবেদন করা হয়েছে এবং স্থানীয় জনগণকে নিয়ে পাবলিক কনসালটেশন সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী সকল ফি ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়েছে। পাশাপাশি পরিকল্পিত বনায়নের কাজও কমিটির মাধ্যমে নিয়ম মেনে সম্পন্ন করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

প্রতিটি চারা রোপণের ছবি, কোটেশন, বিল-ভাউচার এবং প্রয়োজনীয় নথি সংরক্ষিত রয়েছে বলেও জানানো হয়।

সবশেষে প্রকল্প পরিচালক আব্দুল গফুর বলেন, “এটি একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়। ডিপিপি প্রণয়ন থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যন্ত আমরা আন্তরিকভাবে কাজ করেছি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দপ্তর, হল, ক্যাফেটেরিয়া ও প্রশাসনিক ভবনে ব্যবহৃত ফার্নিচার বর্তমানে বিদ্যমান রয়েছে।

প্রয়োজনে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটির মাধ্যমে সরেজমিনে যাচাই করা যেতে পারে। নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত সত্য অবশ্যই বেরিয়ে আসবে।”