উপজাতি সন্ত্রাসীদের সংঘাতে বান্দরবানে ৩ মাসে ৩০ খুন


নিজস্ব প্রতিবেদক    |    ১০:০৭ এএম, ২০২২-০৩-১০

উপজাতি সন্ত্রাসীদের সংঘাতে বান্দরবানে ৩ মাসে ৩০ খুন

বান্দরবান জেলার রুমা, থানছি ও রোয়াংছড়ি উপজেলায় হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে হত্যাকাণ্ড। পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠন জনসংহতি সমিতি—জেএসএস (মূল দল), জেএসএস (সংস্কারপন্থী), ইউপিডিএফ (মূল দল), ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক), মগ লিবারেশন পার্টি (এমএলপি), ম্রো ন্যাশনাল পার্টিসহ (এমএনপি) বিচ্ছিন্ন আরো কয়েকটি সশস্ত্র গ্রুপের তৎপরতা রয়েছে পাহাড়ের সর্বত্র। পুলিশ বলছে, পাহাড়ে আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজির দ্বন্দ্বে সশস্ত্র গ্রুপগুলোর হামলা, পাল্টা হামলা সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে।পাহাড়ে অস্ত্রের ঝনঝনানি ও খুনোখুনির ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। রবিবার রাতে জেএসএস (মূল দল) ও এমএলপির মধ্যে গোলাগুলির ঘটনায় রোয়াংছড়ির কানানপাড়া ঘাট থেকে উদ্ধার হওয়া চার জনের লাশের পরিচয় এখনো শনাক্ত হয়নি। বেওয়ারিশ হিসেবে তাদের লাশ সৎকার করা হয়েছে।

জেলা পুলিশের গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে রোয়াংছড়ি, রুমা ও থানছি উপজেলায় সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের উভয় পক্ষের গোলাগুলিতে খুন হয়েছে ৩০ জন। গত ২ ফেব্রুয়ারি রুমার বথিপাড়ায় জেএসএস (মূল দলের) হামলায় সেনাবাহিনীর একজন জ্যেষ্ঠ ওয়ারেন্ট অফিসার নিহত হন। ঐ ঘটনায় জনসংহতি সমিতির তিন সদস্যও নিহত হন। ২৬ ফেব্রুয়ারি রোয়াংছড়িতে জেএসএস সদস্য মংশৈসিং মারমাকে বাড়ির সামনে গুলি করে হত্যা করা হয়। গত ৪ মার্চ রোয়াংছড়িতে ৪৫ বছরের এক নারীকে ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়।

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি রুমার আউপাড়ায় জমি নিয়ে বিবাদে পাড়া প্রধান ও তার চার ছেলেকে হত্যা করেন প্রতিবেশীরা। গত বছরের ২৬ডিসেম্বর সদর উপজেলার রাজবিলা ইউনিয়নের রমতিয়া পাড়া থেকে মগ বাহিনীর কিরণময় তঞ্চঙ্গ্যাকে অপহরণ করে হত্যা করা হয়। ১৩ ডিসেম্বর রাজবিলায় ইউনিয়নে জেএসএস মূল এর সদর উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক পুশেথোয়াই মারমাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ২৩ নভেম্বর তারাছা ইউনিয়নের তালুকদার পাড়ায় আওয়ামী লীগের কর্মী‌ উথোয়াইনু মারমাকে হত্যা করে জেএসএস কমী‌র্রা।

পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সেনাবাহিনীর অভিযান আরো জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ভুক্তভোগী বাঙালি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজন অভিযোগ করেন, উন্নয়ন কাজের ঠিকাদার, ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান, কৃষক, শ্রমিক মৎস্যজীবী, সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী, যানবাহন, হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল, বিভিন্ন মৌসুমী ফলসহ সব প্রকার খাত থেকে চাঁদা দিতে হয়।

চাঁদা না দিলে করা হয় অপহরণ, নিপীড়ন, নির্যাতন এমনকি খুনও। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঝে মধ্যে অবৈধ অস্ত্র-গুলি উদ্ধার করলেও এদের নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা বিধায় পুলিশ ও সেনাবাহিনী সন্ত্রাসীদের আস্তানায় পৌঁছানোর আগেই সন্ত্রাসীরা তাদের আস্তানা ছেড়ে পালিয়ে যায়। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে সন্ত্রাসী আটক ও লাশ উদ্ধার হলেও সাক্ষী প্রমাণের অভাবে কোনো অপরাধীর শাস্তি হয় না। যে সাক্ষী দিতে যাবে, তাকে হত্যা করা হবে। এই কারণে কেউ সাক্ষী দিতে চান না।

এ বিষয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং এমপি বলেছেন, পাহাড়ে শান্তির জন্য সবাইকে আন্তরিক হতে হবে। সেনাবাহিনীর ওপর হামলার দায় জেএসএস এড়াতে পারে না। তিনি বলেন, ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে সব অস্ত্র প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে জমা দেওয়া হয়। তারপরও পাহাড়ে এত অস্ত্র কেন? তাহলে কি এখনো পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্র রয়ে গেছে? তিনি বলেন, পার্বত্য শান্তি চুক্তির পর পাহাড়ে যারা অস্ত্রের ব্যবহার করছেন, তারা কারা? সরকার শান্তিচুক্তি করেছে, বাস্তবায়নও করছে। খুন করে শান্তি আসবে না।

পার্বত্য নাগরিক পরিষদের সভাপতি কাজী মুজিবুর রহমান বলেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জেলা হিসেবে পরিচিত বান্দরবান সংঘাতের জেলায় পরিণত হয়েছে। পাহাড়ে শান্তি ফেরাতে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের কোনো বিকল্প নেই। তিনি বলেন, পাহাড়ে অধিক হারে সেনা ক্যাম্প ও সেনাবাহিনী বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি।তিনি সন্তু লারমার জাতীয় পতাকা ও নিরাপত্তা প্রত্যাহার করার দাবি জানান সরকারের কাছে।

বান্দরবানের পুলিশ সুপার জেরিন আখতার বলেন, বান্দরবানে একের পর এক হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটিয়ে সশস্ত্র গ্রুপগুলো সক্রিয় হয়ে উঠছে। প্রতিটি হত্যাকাণ্ড ও হামলা এক সুতোয় বাঁধা মনে হচ্ছে। আমরা সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে অভিযান শুরু করছি।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) জেলা সেক্রেটারি অংচংমং মারমা বলেন, অধিকার আদায়ের সংগ্রামের নামে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে পাহাড়ের সশস্ত্র গ্রুপগুলো। পাহাড়ে চাঁদাবাজি, অপহরণ, হত্যা—এগুলো নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব বন্ধে সরকারকে আলোচনার পাশাপাশি আরো অধিক কঠোর হতে হবে