রাঙামাটি শহরে নিষিদ্ধ সংগঠনের চাঁদাবাজ সন্ত্রাসীরা বহাল তবিয়তে; ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী


নিজস্ব প্রতিবেদক    |    ০৩:১৮ পিএম, ২০২৫-০২-২৩

রাঙামাটি শহরে নিষিদ্ধ সংগঠনের চাঁদাবাজ সন্ত্রাসীরা বহাল তবিয়তে; ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী

ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পরও পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে ফ্যাসিস্টের দোসররা এখানো বহাল তবিয়তে আছে। চালিয়ে যাচ্ছে তাদের চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কার্যক্রম। সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত চাঁদা প্রদানের জন্য হুমকি প্রদর্শন করছে। যেখানে ভবন উঠছে সেখানে চাঁদা দাবি করছে। অপারগতা প্রকাশ করলে জানে মেরে ফেলা হুমকি দিচ্ছে। বলছি জেলা শহরের গুরুত্বপূর্ন আলম ডক ইয়ার্ড এলাকায় তান্ডব চালানো নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের দৌরাত্বের কথা।


এই এলাকায় সাধারণ মানুষদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ে সামনের সারি থেকে নেতৃত্বে দিচ্ছেন জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাবেক সহ-সভাপতি ট্রাক ড্রাইভার হাবিবুর রহমান বাপ্পী। সাথে রয়েছে তার দুই সহোদর ছাত্রলীগ নেতা মো. রাব্বী ও মো. রাকিব।


এ গ্যাংটির সাথে আরো জড়িত রয়েছে বর্তমানে জেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকসহ আরও অজ্ঞাত কয়েকজন। গ্যাংটি পুরো এলাকায় অর্ধকোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। গ্যাংটি ওই এলাকায় সাবা টাউয়ারের মালিক প্রবাসী মো. ইউনুছকে  ভয়ভীতি প্রদর্শন করে দশ লক্ষ টাকা চাঁদা আদায় করেছে। এ মাফিয়া চক্রটি শুধু চাঁদা নিয়ে থেমে থাকেনি। ওই ভবনের নিচ তলায় আয়না ঘর বানিয়ে সাধারণ মানুষদের আটক করে মারপিট করে চাঁদা আদায় করতো।


জানা গেছে, সন্ত্রাসীদের চাঁদার দশ লক্ষ টাকা পরিশোধ করেছে সাবা টাউয়ারের মালিকের শশুর মো. মান্নান (কোম্পানী)। চাঁদাবাজির পাশাপাশি এ মাফিয়া চক্রটি স্থানীয় অনেক নারীকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করেছে। তবে সম্প্রতি আনোয়ার হোসেন কায়সারকে চট্টগ্রাম থেকে পুলিশ আটক করলেও গ্যাংটির সন্ত্রাসী কার্যক্রম এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছে।

ফ্যাসিস্ট আমল থেকে  এ পর্যন্ত  মাফিয়া এ গ্যাংটির অত্যাচারের শিকার হয়নি এমন লোক এ এলাকায় কম রয়েছে। তাদের ভয়ে সাধারণ মানুষ তটস্থ থাকে। ভয়ে কেউ মুখ খুলছে না। আবার যারা মুখ খোলার চেষ্টা করছে তাদের প্রতিনিয়ত হুমকি দেওয়া হচ্ছে। সারাদেশের ন্যায় রাঙামাটিতে ডেভিল হান্টের অভিযান শুরু হয়েছে। তবে কোন এক অদৃশ্য শক্তির কারণে গ্যাংটির লাগাম টানা যাচ্ছে না। গ্যাংটি দিনকে দিন বেপেরোয়া হয়ে উঠছে। 


চাঁদাবাজির পাশাপাশি, স্কুল-কলেজের ছাত্রীদের ইভটিজিং, প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি, গ্যাং নিয়ে আড্ডাবাজি, সীমান্ত পথ ব্যবহার করে ভারতীয় সিগারেট বিক্রিসহ নানা অপকর্মে লিপ্ত  থাকা এই গ্যাংটির নেতৃত্বে থাকা ছাত্রলীগ নেতা বাপ্পী মোটরসাইকেল চোর চক্রের অন্যতম সদস্য বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।


সন্ত্রাসী এ মাফিয়া গ্যাংটির অত্যাচারের শিকার ভুক্তভোগী মো. জাহাঙ্গীর বলেন, তিনি বনরূপা হর্টিকালচার সেন্টারে মাশরুম তৈরির দৈনিক শ্রমিক হিসেবে কর্মরত রয়েছে।

ফ্যাস্টিস্ট সরকার পতনের আগে অর্থাৎ ২০২৪ সালের ২৮ জুন মাসে তিনি এবং তার আরেক দুই সহকর্মী মো. মনির ও মো. হাফিজ ঠেলাযোগে মাশরুম নিয়ে লেকার্স স্কুল এন্ড কলেজ রোড এলাকায় তাদের ভাড়া বাড়িতে আসার সময় সন্ত্রাসী বাপ্পী এবং গ্যাংয়ের সদস্যরা তাদের গতিরোধ করে এবং কয়েক লিটার পাহাড়ি চোলাই মদ দিয়ে তাদের ফাঁসানোর চেষ্টা করে। 


এরপর গ্যাংটি এক পর্যায়ে পার্শ্ববর্তী তাদের আয়না ঘর খ্যাত সাবা টাওয়ারে নিয়ে জাহাঙ্গীর এবং তার অপর দুই সঙ্গীকে পিছন মোড়া দিয়ে বেধেঁ পেলে। বেধড়ক মারধর করতে করতে বলতে থাকে পাঁচ লক্ষ টাকা চাঁদা দিতে হবে, না হয় প্রাণে মেরে ফেলা হবে। 


জাহাঙ্গীর আরও বলেন, আটক থাকা অবস্থায় আমার স্ত্রীকে ফোন করার জন্য বলে সন্ত্রাসীরা। আমার স্ত্রী আমাকে বাঁচাতে আমার জায়গা বন্ধক রেখে  ৪ লক্ষ টাকা আসামীদেরকে দেয়। আসামীরা টাকা পেয়ে ঘটনার দিনগত আনুমানিক রাত ৩টার দিকে তাদের তিনজনকে ছেড়ে দেয়। 


ভুক্তভোগী রং মিস্ত্রী আকতার হোসেন বলেন, আমি এ এলাকায় নির্মিত একটি ভবনে রং করার সময় সন্ত্রাসী বাপ্পীর ছোট ভাই আরেক সন্ত্রাসী রাব্বি তাকে রংয়ের কাজ থেকে বিরত থাকতে নিষেধ করে এবং বলতে থাকে মালিকের সাথে আমাদের বোঝাপড়া আছে। তিনি আমাদের পাঁচ লক্ষ টাকা দিলে এরপর কাজ চলবে।


ভুক্তভোগী মো. করিম বলেন, সন্ত্রাসী বাপ্পীর ছোট ভাই ছাত্রলীগ নেতা রাকিব এবং  কাউসার আমার নব নির্মিত ভবনে গিয়ে আমার ছয়জন মিস্ত্রিকে তুলে নিয়ে এসে তাদের আয়না ঘরে ব্যাপক মারধর করে। তাদের সাথে  থাকা মোবাইল ছিনিয়ে নেই। এরপর আমি ঘটনার খবর শুনার পর বাঘাইছড়ি থেকে এসে তাদের গ্যাং লিডার বাপ্পীকে জানায়। কিন্তু কোন সৎ বিচার পায়নি। উল্টো আমার নির্মাণ শ্রমিকদের বলে আসে তাদেরকে যেন ৩০ হাজার টাকা প্রদান করা হয়। 


একই এলাকার আরেক স্থানীয় কাঠ ব্যবসায়ী বদিউল আলম বলেন, সন্ত্রাসী বাপ্পী এবং তাদের গ্যাংয়ের ভয়ে আমরা তটস্থ থাকি। গ্যাংটি আমাদের অর্ধেক জায়গায় ঘর করতে দিচ্ছে না। আমি এবং আমার পরিবার এ গ্যাংটির থেকে রেহাই পেতে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সাহায্য কামনা করছি।


তবে এলাকার সচেতন মহল বলছে, এইভাবে আর চলতে দেওয়া যায় না। এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা কাঠ ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক নেতা জয়নাল আবেদীন জুনু সওদাগর বলেন, এইভাবে আর চলতে দেওয়া যায় না। এসব চাঁদাবাজদের এখনি প্রতিহত করতে হবে। চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে সামাজিক ভাবে আন্দোলনের পাশাপাশি অভিলম্বে এসব কুখ্যাত সন্ত্রাসী চাঁদাবাজদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন।


এলাকার স্থানীয় রাঙামাটি আসবাবপত্র ব্যবসায়ী কল্যাণ বহুমুখী সমাবায় সমিতি লি: এর সাবেক সভাপতি হাজী কামাল উদ্দিন বলেন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ মুক্ত এলাকা চাই আমরা।

এতদিন ভয়ে মুখ খুলেনি। এইবার দেয়ালে পিঠ টেকে গেছে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি অনুরোধ তাদের অভিলম্বে আইনের আওতায় এনে শাস্তি প্রদানের জোর দাবি জানাচ্ছি।


এই বিষয়ে রাঙামাটির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মারুফ আহমেদ বলেন, আইন শৃঙ্খল পরিস্থিতি সমুন্নত রাখার জন্য বিশেষ অভিযান চলছে। এরই ধারাবাহিকতায় রাঙামাটি জেলা পুলিশ কর্তৃক এ অভিযান অব্যাহত আছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে এবং নিয়মিত মামলা দায়ের করা হচ্ছে। যারা ভুক্তভোগী রয়েছে তারা অভিযোগ দিলে আমরা সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করছি।