খাগড়াছড়িতে সেনাক্যাম্প স্থাপনে বাধার প্রতিবাদে ঢাকায় বিক্ষোভ


আলমগীর মানিক    |    ১১:৫১ পিএম, ২০২৫-১০-২৮

খাগড়াছড়িতে সেনাক্যাম্প স্থাপনে বাধার প্রতিবাদে ঢাকায় বিক্ষোভ

আজ ২৮ অক্টোবর ২০২৫, মঙ্গলবার বিকাল ৩:০০ ঘটিকায় সার্বভৌমত্ব সুরক্ষা পরিষদ-এর স্টুডেন্টস ইউনিট-এর উদ্যোগে "খাগড়াছড়ির লক্ষ্মীছড়িতে সেনা ক্যাম্প স্থাপনে বাঁধা প্রদান ও উপজাতীয় উগ্রপন্থী কর্তৃক সরকারি খাস জমি দখলের প্রতিবাদে রাজু ভাস্কর্য থেকে শাহবাগ পর্যন্ত বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন" অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিচারপতি আব্দুস সালাম মামুন। লে. কর্নেল ফরিদুল আকবর (অব.)-এর সভাপতিত্বে ও মোঃ মোস্তফা আল ইহযায-এর সঞ্চালনায় আরও উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক ড. আবু মূসা, মোঃ আরিফ বিল্লাহ (ভিজিটিং প্রফেসর, জংজু নরমাল ইউনিভার্সিটি, চীন), মিজানুর রহমান চৌধুরী, লাভ বাংলাদেশ পার্টির চেয়ারম্যান, ড. হেলাল উদ্দিন (ঢাকা মহানগর দক্ষিণের নায়েবে আমীর ও ঢাকা-০৮ এর মনোনীত প্রার্থী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামি), আবু সালেহ আকন (সাংবাদিক নেতা ও ডিআরইউর সভাপতি), এড. তাছমিম রানা (সাবেক সাংসদ, বিএনপি), ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রোকনউদ্দোলা (অব.), ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেন, মুফতী শহীদুল ইসলাম (জেনারেল সেক্রেটারি, বৈষম্যহীন কারামুক্তি আন্দোলন ও হেফাজত নেতা), লে. কর্নেল আসাদ উদ্দিন (অব.), লে. কর্নেল ফেরদৌস আজিজ (অব.), লে. কর্নেল হাসিনুর রহমান (অব.), মেজর মাসুদ (অব.), শামীম রেজা, মেজর শাহিন আলম (অব.), মেজর মিজানুর রহমান (অব.), জাহিদুর ইসলাম শিশির (সভার সম্পাদক, কালের ছবি), এস. এম. জহিরুল ইসলাম, আতাউল্লাহ খান, এড. জাকির সিরাজি, মুজাম্মেল হক মিয়াজী, আব্দুল কাদের (ছাত্র নেতা, ঢাবি), তুহিন খান (ছাত্র নেতা, ঢাবি), ড. শরিফ শাকি, রাসেল মাহমুদ, সাংবাদিক নেতা তাজুল ইসলাম সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

মানববন্ধনে নেতৃবৃন্দ বলেন, খাগড়াছড়ির লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার বর্মাছড়িতে (বার্মাছড়ি) রাষ্ট্রীয় খাস জমি দখল করে উগ্রপন্থী সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠন ইউপিডিএফ সেনাবাহিনীর ক্যাম্প স্থাপনে বাধা প্রদান করছে। তারা বলছেন, ওই এলাকা ইউপিডিএফ-এর ঘাঁটি; এখান থেকেই উগ্রপন্থীরা অত্র-অঞ্চলের সকল সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে।

এলাকাটিতে সন্ত্রাসীদের অস্ত্রের গোডাউন এবং ট্রেনিং ক্যাম্প রয়েছে; এখান থেকে প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রশিক্ষণ ও সশস্ত্র মহড়া পরিচালিত হয়। এলাকাটি দুর্গম হওয়ায় সন্ত্রাসীরা নিরাপদে দেশবিরোধী কর্মকাণ্ড চালাতে পারে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় সেনাবাহিনীর ক্যাম্প স্থাপন ও নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়ে আসছি। সেনা ক্যাম্প স্থাপিত হলে সন্ত্রাসীরা দেশবিরোধী কার্যক্রম চালাতে পারবে না।

তাই ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীদের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। এই জায়গায় সেনা ক্যাম্প স্থাপন ঠেকাতে তারা নিরীহ পাহাড়ি জনগণ — বিশেষ করে নারী ও শিশুদের— রাষ্ট্র ও নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে উসকানি দিচ্ছে।

নেতারা বলেন, ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীরা সেনা ক্যাম্প স্থাপন না করানোর জন্য ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেছে। স্মারকলিপিতে যে কারণগুলো দেখানো হয়েছে সেগুলো সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও হাস্যকর।

সেখানে বলা হয়েছে, সেনা ক্যাম্প স্থাপিত হলে বিহারের ভিক্ষুশ্রেণীর চলাচলে নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি হবে — যা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। উক্ত এলাকায় সেনাবাহিনী স্থাপিত হলে নিরাপত্তা বৃদ্ধি পাবে এবং সন্ত্রাসীদের অনাগোনা বন্ধ হবে; বৌদ্ধ ভিক্ষুরা নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে বিহারে যাতায়াত করতে পারবে।

অনতিবিলম্বে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং দেশের স্বার্থে বর্মাছড়ি এলাকায় সেনা ক্যাম্প স্থাপন করে ইউপিডিএফসহ সকল উগ্রপন্থী সন্ত্রাসীদের চিরতরে নির্মূল করার দাবি জানাচ্ছে “সার্বভৌমত্ব সুরক্ষা পরিষদ”।

এ সময় সার্বভৌমত্ব সুরক্ষা পরিষদের প্রধান সমন্বয়ক মোস্তফা আল ইহযায বলেন, “১৮৮৪ সালে ব্রিটিশ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের শাসন ও রাজস্ব সংগ্রহের দোহাই দিয়ে ৩টি সার্কেল সৃষ্টি করেছিল। ১৮৯২ সালে এই আইনের আংশিক সংশোধন করে ফরেস্ট সার্কেল নামে একটি নতুন সার্কেলসহ মোট ৪টি সার্কেল সৃষ্টি করা হয়।

তৎকালীন সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে রিজার্ভ ফরেস্ট সার্কেল সৃষ্টি করা হয়েছিল। রিজার্ভ ফরেস্ট সার্কেল ব্রিটিশ সরকারের বনবিভাগের নিয়ন্ত্রণে ছিল। শুধু তাই নয়, ১৯০০ সালের শাসনবিধিতে অপরাধ দমন, শান্তি রক্ষা ও নিয়ন্ত্রণ, ফৌজদারি ও দেওয়ানি বিচার ব্যবস্থা ইত্যাদি বিষয় ব্রিটিশ শাসকের এখতিয়ারে ছিল।

একজন ডেপুটি কমিশনারের তত্ত্বাবধানে মাত্র ৩টি সার্কেলের ভূমি ব্যবস্থাপনা ও রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা ছিল সার্কেল চিফদের। রাজস্ব আদায়ের জন্য নিয়োগকৃত ব্যক্তি কখনোই জমির মালিক কিংবা হস্তান্তরের পূর্ণ এখতিয়ার পেতে পারে না — এটি ১৮৮৪ সালের বিধিতেও স্বীকৃত হয়নি। ১৮৮৪ সালে প্রদত্ত ক্ষমতাকে অবৈধভাবে কাজে লাগিয়ে সার্কেল চিফগণ পার্বত্য ভূমি থেকে বাঙালি জনগোষ্ঠীকে বিতাড়িত করে হাজার হাজার একর জমি উপজাতিদের নামে বন্দোবস্ত করে নিয়েছে।

আমরা ১৮৮৪ সাল থেকে আজ পর্যন্ত বন্দোবস্তকৃত সকল জমির বন্দোবস্ত বাতিলের দাবি জানাচ্ছি।”

দেশবাসীকে উদ্দেশ্য করে তিনি আরও বলেন, ১৯২৯ সালে ভারত পার্বত্য চট্টগ্রামকে সম্পূর্ণ শাসনবহির্ভূত অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল; এতে উপজাতিদের জাতিসত্ত্বা রক্ষার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হয়েছিল। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ উপজাতিদের স্বীকৃতি প্রদান করে তাদের আত্মপরিচয় ফিরিয়ে দিয়েছে। তবুও পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ভারতের প্ররোচনায় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বিনষ্টের ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে।

তাদের ধারাবাহিকতায় পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে “সেনা হঠাও, বাঙালি হঠাও” শ্লোগান উঠছে। ছয়টি সশস্ত্র সংগঠন মিলে আন্তর্জাতিকভাবে দেশের সুনাম ক্ষুণ্ন করছে। আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো শ্লোগান শুনতে চাই না। পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্তবর্তী এলাকায় সীমান্ত সড়ক নির্মাণ, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া, ড্রোনের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা নজরদারি চালিয়ে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কার্যকর অভিযান চালাতে হবে।

দেশের অখণ্ডতা রক্ষার জন্য প্রতিটি জেলায় প্রতিটি মৌজায় সর্বনিম্ন একটি করে সেনা ক্যাম্প স্থাপন জরুরি। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও নেপালের মতো পার্বত্য অঞ্চলের সুরক্ষায় সেনাবাহিনীর একটি বিশেষায়িত “মাউনটেন ডিভিশন” গঠন করার প্রস্তাব রাখছি।”

তিনি আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে দু ধরনের ভূমি মালিকানার চর্চা আছে — ক) প্রথাগত মালিকানা, খ) প্রচলিত আইনি স্বীকৃত মালিকানা। বর্তমান আধুনিক যুগে প্রথাগত মালিকানা যে কোনোভাবে আইনি স্বীকৃত নয় এবং ১৯০০ সালের শাসনবিধিতেও তা স্বীকৃত ছিল না। ১৮৭০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের একাংশ এলাকায় সংরক্ষিত বনাঞ্চল ছিল; সেই বনাঞ্চল আজ অনেকটাই দখলে নেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয় খাস জমি এবং সংরক্ষিত বনাঞ্চল উপজাতীয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীদের দখলে চলে গেছে।

সম্প্রতি, ২৪ অক্টোবর খাগড়াছড়ি জেলার লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার বর্মাছড়ি ইউনিয়নের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা ক্যাম্প স্থাপন করতে গেলে সন্ত্রাসীরা বাধা প্রদান করে; রাস্তায় গাছ কেটে সেনাবাহিনীর চলাচল ব্যাহত করেছে। উগ্রপন্থী সশস্ত্র সংগঠন নারী নেত্রীদের এনে দেশের পক্ষে সযত্নে কাজ করা সেনাবাহিনীর সম্মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

সেনা ক্যাম্প নির্মাণের জন্য নির্ধারিত জায়গায় রাতের আঁধারে বৌদ্ধ মূর্তি স্থাপন করে ধর্মকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করা হয়েছে — যা আমরা তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।

তিনি আহ্বান জানান, আগামী ৭ দিনের মধ্যে বর্মাছড়ি এলাকায় সন্ত্রাস দমন করে শুকনাছড়ি গ্রামে সেনা ক্যাম্প স্থাপনের কাজ শুরু করতে হবে। অনতিবিলম্বে রাষ্ট্রীয় খাস জমি ও সংরক্ষিত বনাঞ্চলের দখলদারদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে রাষ্ট্রীয় সকল জমি উদ্ধার করার জোর দাবি জানাচ্ছি। অন্যথায় দেশপ্রেমিক জনগোষ্ঠী নিয়ে দখলদারদের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।

মানববন্ধন শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। বিক্ষোভ মিছিলটি রাজু ভাস্কর্য থেকে শুরু করে শাহবাগে গিয়ে শেষ হয়।