ইন্তেকাল করলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া


নিজস্ব প্রতিবেদক    |    ০২:৫৪ পিএম, ২০২৫-১২-৩০

ইন্তেকাল করলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া

মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) বাংলাদেশ সময় সকাল ৬টায় রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিএনপির তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান এবং দলের চেয়ারপারসনের সাবেক প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান।

দীর্ঘদিন ধরে নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন তিনি। গত ২৩ নভেম্বর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

পরবর্তীতে ২৭ নভেম্বর তার ফুসফুসে সংক্রমণ ধরা পড়লে অবস্থার অবনতি ঘটে এবং তাকে কেবিন থেকে হাসপাতালের ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) স্থানান্তর করা হয়। সেখানেই অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

চিকিৎসক সূত্রে জানা গেছে, বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে লিভার ও কিডনি জটিলতা, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, আথ্রাইটিসসহ নানা দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত ছিলেন।

পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে ইনফেকশনজনিত সমস্যাও তার শারীরিক অবস্থাকে আরও সংকটাপন্ন করে তোলে।

বেগম খালেদা জিয়া ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ইস্কান্দার মজুমদার, যার বাড়ি ফেনী জেলার পরশুরাম উপজেলার শ্রীপুর গ্রামে।

তার মা তৈয়বা বেগমের জন্ম পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার চন্দনবাড়ী গ্রামে। পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। জন্মের পর তার নাম রাখা হয় ‘খালেদা খানম’।

শৈশবে তার সৌন্দর্যের কারণে পরিবারের সদস্যরা তাকে আদর করে ‘পুতুল’ বলে ডাকতেন, যা পরবর্তীতে তার ডাকনাম হয়ে ওঠে।

তিনি প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন সেন্ট যোসেফ কনভেন্টে। পরে দিনাজপুর সরকারি স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট (উচ্চমাধ্যমিক) পাস করেন।

শৈশব থেকেই বেগম খালেদা জিয়া পরিচ্ছন্নতা ও পরিপাটির প্রতি বিশেষ যত্নবান ছিলেন। ফুলের প্রতি তার গভীর ভালোবাসা ছিল।

নিজের ঘর তিনি নিয়মিত পরিষ্কার রাখতেন এবং ফুল দিয়ে সাজিয়ে তুলতেন। এই অভ্যাস তার পরবর্তী জীবনেও বজায় ছিল।

১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট দিনাজপুরের মুদিপাড়ায় অবস্থিত পৈতৃক বাড়িতে সেনাবাহিনীর তরুণ কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তার বিয়ে সম্পন্ন হয়।

বিয়ের পর থেকেই তিনি ‘বেগম খালেদা জিয়া’ নামে পরিচিতি লাভ করেন।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শহীদ হওয়ার পর থেকেই বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ঘটে। তার মৃত্যুর পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লে তিনি দলের হাল ধরেন।

১৯৮২ সালের ৪ জানুয়ারি তিনি বিএনপির সদস্যপদ গ্রহণ করেন এবং ধাপে ধাপে রাজনৈতিক নেতৃত্বে উঠে আসেন।

দলীয় রাজনীতির নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ভাইস চেয়ারম্যান, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন শেষে ১৯৮৪ সালে তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।

দীর্ঘ ৪৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনের মধ্যে ৪১ বছরই তিনি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলটির শীর্ষ নেতৃত্বে ছিলেন।

স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে আপসহীন ভূমিকার কারণে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

১৯৮৬ সালের নির্বাচনে অংশ না নেওয়া এবং ১৯৮৭ সালে ‘এরশাদ হটাও’ একদফা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে তিনি রাজনীতিতে দৃঢ় অবস্থান তৈরি করেন।

তার নেতৃত্বে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয়।

ওই বছরের ২০ মার্চ তিনি বঙ্গভবনে শপথ গ্রহণের মাধ্যমে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পাকিস্তানের বেনজির ভুট্টোর পর তিনি মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।

পরবর্তীতে তিনি ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে আরও দুইবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া ১৯৯৬ ও ২০০৯ সালে জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্বও পালন করেন তিনি।

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন।