জামায়াতের জোটে এনসিপি-জটিলতা


মেহেদী হাসান    |    ১১:০৫ এএম, ২০২৬-০১-০৩

জামায়াতের জোটে এনসিপি-জটিলতা

শেষ মুহূর্তে এনসিপি, এলডিপি ও এবি পার্টি যুক্ত হওয়ায় জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ইসলামপন্থি দলগুলোর নির্বাচনী আসন সমঝোতায় নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।

নতুন এই তিন দলকে মোট ৪০টি আসন ছাড় দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত হলেও—কোন দল কতটি আসন ছাড়বে, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে জটিলতা। ফলে মনোনয়নপত্র দাখিল শেষ হলেও এখনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি।

জোটসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জামায়াতের প্রস্তাব ছিল—নতুন তিন শরিকের জন্য জামায়াত ১৬টি, চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন ১৬টি এবং বাকি ছয় শরিক দল মিলে আটটি আসন ছাড়বে।

তবে ইসলামী আন্দোলন ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস নিজ নিজ অংশ থেকে এত আসন ছাড়তে রাজি হয়নি। তাদের দাবি, নতুন শরিকদের জন্য প্রয়োজনীয় আসন জামায়াতের অংশ থেকেই ছাড় দিতে হবে।

জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলের নির্বাচনী সমঝোতা প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত নেতারা জানান, আলোচনায় এনসিপিকে ৩০টি, এলডিপিকে সাতটি এবং এবি পার্টিকে তিনটি আসন দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

তবে এই আসনগুলো কোন কোন দল ছাড়বে—তা নির্ধারণ না হওয়ায় সংকট কাটছে না। বরং সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে জটিলতা আরও বাড়ছে।

গত মে মাসে ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, নেজামে ইসলাম পার্টি ও খেলাফত আন্দোলন মিলে একটি ইসলামপন্থি নির্বাচনী মোর্চা গঠনের উদ্যোগ নেয়।

পরে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম সে উদ্যোগ থেকে সরে গিয়ে বিএনপি জোটে যোগ দেয়।

ইসলামপন্থি ভোট একত্রিত করার লক্ষ্য নিয়ে গত সেপ্টেম্বরে জামায়াত এতে যুক্ত হয়। একই সময়ে জাগপা ও বিডিপিও এই জোটে যোগ দেয়।

এরপর এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদ ও এবি পার্টি আলোচনায় অংশ নিলেও পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন দাবির আন্দোলনে যুক্ত না হওয়ায় তারা সরে যায়।

গত নভেম্বরে এনসিপি, এবি পার্টি ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন আলাদা জোট গঠন করে।

পরে বিএনপির সঙ্গে আলোচনা ব্যর্থ হলে এনসিপি ও এবি পার্টি গত ২৪ ডিসেম্বর থেকে জামায়াতের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে, যা প্রকাশ্যে আসে ২৬ ডিসেম্বর।

পরদিনই এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়।

৩০টি আসনে সমঝোতা হলেও এনসিপি আরও কিছু আসনের দাবি জানায়। দলটি বর্তমানে ৪৪টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ছাত্রনেতাদের নেতৃত্বে গঠিত দল হওয়ায় নিজেদের রাজনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরছে তারা।

অন্যদিকে, দীর্ঘ ১৩ বছর বিএনপি জোটে থাকা কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রমের নেতৃত্বাধীন এলডিপি সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতের সঙ্গে জোটে আসে।

সাতটি আসনে সমঝোতা হলেও এলডিপি ২৪টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে।

এবি পার্টিকে তিনটি আসন ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফেনী-২ ও বরিশাল-৩ আসনে জামায়াত প্রার্থী দেয়নি। তবে এবি পার্টি অন্তত ছয়টি আসন চাওয়ায় এখনো তারা আনুষ্ঠানিকভাবে জোটে যোগ দেয়নি।

এনসিপির পক্ষ থেকে শর্ত দেওয়া হয়েছে—তাদের জোটের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং ইসলামী আন্দোলনের চেয়ে অন্তত একটি আসন বেশি দিতে হবে।

এতে ইসলামী আন্দোলনের নেতারা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। দলটির জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলেন, এনসিপির দেশজুড়ে ভোট ও সাংগঠনিক শক্তি কতটুকু।

জামায়াতের এক জ্যেষ্ঠ নেতা জানান, দলীয় জরিপ অনুযায়ী এনসিপির প্রায় ৬ শতাংশ জনসমর্থন রয়েছে।

নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলটিকে গুরুত্ব দিয়ে জোটে নেওয়া হয়েছে। তবে এনসিপিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় পুরোনো শরিকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

জামায়াত ২৭৬টি আসনে প্রার্থী দিলেও ইসলামী আন্দোলন দিয়েছে ২৬৮টি আসনে।

এমনকি যেসব আসনে জামায়াত নতুন শরিকদের জন্য ছাড় দিয়েছে, সেখানেও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী থাকায় সমঝোতা বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

জামায়াতের হিসাবে এখন পর্যন্ত ২৪৮টি আসনে সমঝোতা হয়েছে। বাকি ৫২টি আসনে জরিপের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও ইসলামী আন্দোলন ও বাংলাদেশ খেলাফত তা মানেনি।

নতুন শরিক যুক্ত হওয়ায় জামায়াত ও অন্যান্য পুরোনো মিত্রদের মধ্যে আসন ছাড় নিয়ে টানাপোড়েন তীব্র হয়েছে।

তবে প্রকাশ্যে সব পক্ষই বলছে, আলোচনা চলছে এবং ২০ জানুয়ারি প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময়ের আগেই সমঝোতা হবে।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আবদুল হালিম বলেন, সবাই ছাড় দিয়ে সমঝোতায় পৌঁছাবে। এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব জানান, আলোচনার পর আর কোনো জটিলতা থাকবে না।

আর ইসলামী আন্দোলনের ফয়জুল করীম বলেন, সবাই একসঙ্গে এগোলে কোনো সমস্যাই থাকবে না।