পাহাড়জুড়ে‘নীরব চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য’ভয়-ভীতির ছায়ায় থমকে যাচ্ছে পার্বত্য জনজীবন


নিজস্ব প্রতিবেদক    |    ০৪:১৪ এএম, ২০২৬-০৩-২৬

পাহাড়জুড়ে‘নীরব চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য’ভয়-ভীতির ছায়ায় থমকে যাচ্ছে পার্বত্য জনজীবন

‘অর্থই অনর্থের মূল’ কথাটি যেন পার্বত্য চট্টগ্রামের বেলায় ঠিক মিলে যায়! নানা উৎস থেকে চাঁদাবাজি করে অর্থের পাহাড় গড়তে মরিয়া পাহাড়ের আঞ্চলিক চারটি সংগঠন। টাকার অঙ্কে এ চাঁদাবাজির পরিমাণ বছরে প্রায় ৩৭৫ কোটি টাকা। তাই আধিপত্য বিস্তারে অবৈধ অস্ত্র মজুদ করে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে তারা। এতে পাহাড়ে ক্রমেই নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে উঠছে সশস্ত্র অপতৎপরতা।

পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলাজুড়ে যেন অদৃশ্য এক অর্থনৈতিক দখলদারিত্ব কায়েম হয়েছে। প্রকাশ্যে নয়, বরং নীরব আতঙ্কের আবরণে চলছে সুসংগঠিত চাঁদা আদায়ের মহোৎসব।

অভিযোগ আছে, পাহাড়ে উন্নয়ন প্রকল্প, ঠিকাদার, কাঠ-বাঁশ ব্যবসা, পরিবহন, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, চাষাবাদ-ফসল, পোষাপ্রাণী বিক্রি, চোরাকারবারি, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, মাদক, অস্ত্র ব্যবসাসহ নানা উৎস থেকে নিজেদের নিয়ন্ত্রিত

এলাকায় চাঁদাবাজি করে আসছে আঞ্চলিক দলগুলো। যদিও এসব অভিযোগ স্বীকার করে না কোনো সংগঠনই। 

যেখানে একসময় মাত্র একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব ছিল, সেখানে এখন অন্তত ছয়টি শক্তিশালী গোষ্ঠীর দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষ কার্যত জিম্মি।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, তিন জেলার ২৬টি উপজেলায় এই অবৈধ অর্থ আদায় এখন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো পেয়েছে।

মাসিক, ত্রৈমাসিক এমনকি বার্ষিক ভিত্তিতে নির্ধারিত হারে আদায় করা হচ্ছে অর্থ। নতুন করে যুক্ত হয়েছে ‘স্লিপ’ বা ‘টোকেন’ পদ্ধতি যা চাঁদাবাজিকে আরও সংগঠিত ও নিয়মতান্ত্রিক রূপ দিয়েছে।

দুর্গম পাহাড়ি গ্রাম থেকে শুরু করে শহরতলি; কোথাও রেহাই নেই। ব্যবসায়ী, ঠিকাদার, কৃষক, পরিবহন মালিক, বোট-ট্রলার চালক এমনকি জমি ক্রয়-বিক্রেতারাও পড়ছেন এই চক্রে।

এখানকার মানুষ ছয় সন্ত্রাসী সংগঠনের চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ। ওই সংগঠনের সদস্যরা ৪১টি খাত থেকে বছরে চাঁদা আদায় করছে এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ কোটি টাকা। ওই চাঁদার টাকা তারা বিদেশেও পাঠাচ্ছে।

ভুক্তভোগীরা মুখ খুলতে ভয় পান; কারণ প্রতিবাদ মানেই অপহরণ, হামলা কিংবা সম্পদ ধ্বংসের আশঙ্কা।

একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঠিকাদারের ভাষায়, “চাহিদামতো টাকা না দিলে শ্রমিক অপহরণ, যানবাহন পুড়িয়ে দেওয়া বা ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার মতো হুমকি আসে। বাধ্য হয়েই দিতে হয়।”

বর্তমানে পাহাড়ে সক্রিয় রয়েছে একাধিক আঞ্চলিক সশস্ত্র দল। তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় কালেক্টর ও সাব-কালেক্টর নিয়োগ দিয়ে চাঁদা আদায়ের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে।

ফলে এই অবৈধ অর্থ আদায় এখন অনেকটা ‘নিয়মিত রাজস্ব ব্যবস্থার’ মতো রূপ নিয়েছে।

সরকারি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, শান্তিচুক্তির পর থেকে আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে প্রাণ হারিয়েছেন ১২ হাজারেরও বেশি মানুষ।

অপহরণের শিকার হয়েছেন দুই হাজারের বেশি। প্রতিবছর প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকা আদায় করা হচ্ছে ভয়ভীতি দেখিয়ে।

পণ্য পরিবহনে সংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। একটি ট্রাক ভাড়া যেখানে ৫০ হাজার টাকা, সেখানে পথে পথে দিতে হচ্ছে প্রায় দ্বিগুণ অর্থ চাঁদা হিসেবে।

ফলে খাদ্য সরবরাহ পর্যন্ত ব্যাহত হচ্ছে—কিছু এলাকায় সরবরাহ বন্ধ থাকার ঘটনাও ঘটেছে।

চাঁদা না দেওয়ায় সড়ক নির্মাণ যন্ত্রপাতি নষ্ট করে দেওয়া, সেতু নির্মাণ বন্ধ করে দেওয়া—এসব ঘটনা এখন নিয়মিত।

এমনকি মাছ শিকার পর্যন্ত বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন জেলেরা। উন্নয়ন কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।

প্রশাসন বলছে, ভৌগোলিক প্রতিকূলতা ও দুর্গম এলাকা হওয়ায় অভিযান চালানো কঠিন।

তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অবস্থানের কথা জানালেও বাস্তবে পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হচ্ছে না। 

এক্স-ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য মতে, জেএসএস (সন্তু) বছরে ৪৫০ কোটি টাকা, ইউপিডিএফ (প্রসীত) ৩৫০ কোটি টাকা, ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) ১৫০ কোটি টাকা, জেএসএস (সংস্কার) ১৫০ কোটি টাকা, এমএনপি ৫০ কোটি টাকা এবং কেএনএফ ৫০ কোটি টাকার মতো চাঁদা আদায় করে। সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভ্যাট-ট্যাক্স মওকুফ করলেও তাদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করে ছয়টি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী।

পার্বত্য চট্টগ্রামে এখন যেন এক ‘বোবা অর্থনীতি’ চালু রয়েছে—যেখানে সবাই জানে, সবাই ভোগে, কিন্তু কেউ বলতে পারে না।

ভয়, নীরবতা আর অদৃশ্য শক্তির চাপে পুরো অঞ্চল যেন এক অঘোষিত কর ব্যবস্থার অধীনে চলছে।

এই পরিস্থিতি শুধু নিরাপত্তা নয়, বরং পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি ও উন্নয়নকেই বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।