পার্বত্য চট্টগ্রামে শিক্ষার মান প্রশ্নের মুখে: দায়িত্বহীনতায় ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত


স্মৃতিবিন্দু চাকমা    |    ০৯:২৭ পিএম, ২০২৬-০৫-২১

পার্বত্য চট্টগ্রামে শিক্ষার মান প্রশ্নের মুখে: দায়িত্বহীনতায় ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম জনপদে শিক্ষার মান দীর্ঘদিন ধরেই নাজুক অবস্থায় রয়েছে। নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হওয়া, শিক্ষকদের অনুপস্থিতি, তদারকির অভাব এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা—সব মিলিয়ে পাহাড়ের শিক্ষা ব্যবস্থায় এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ আজ চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে।

রাঙ্গামাটির জুরাছড়ি উপজেলায় রয়েছে ৬৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। অথচ এতগুলো বিদ্যালয় তদারকির জন্য নেই কোনো নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।

অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (টিইও) ও সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (এটিইও)। সীমিত জনবল এবং অতিরিক্ত দায়িত্বের কারণে বিদ্যালয়গুলোতে কার্যকর নজরদারি প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

এর ফলে অনেক বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান কার্যক্রম ভেঙে পড়ছে, যা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করছে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে “বর্গা শিক্ষক” ইস্যু নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এটি মূলত পার্বত্য অঞ্চলের বাস্তব চিত্রেরই প্রতিফলন।

অভিযোগ রয়েছে, কিছু শিক্ষক নিজে বিদ্যালয়ে উপস্থিত না থেকে অন্য ব্যক্তির মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করাচ্ছেন।

এমন অনিয়ম শুধু শিক্ষাব্যবস্থাকে দুর্বল করছে না, বরং সরকারের কোটি কোটি টাকার প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

একজন প্রশিক্ষিত শিক্ষক যদি নিজ দায়িত্ব পালনে অনীহা দেখান, তাহলে সেই প্রশিক্ষণের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে সচেতন মহলে।

পার্বত্য এলাকার প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ জেলা পরিষদের অধীনে হস্তান্তরিত দপ্তর হওয়ায় স্থানীয়ভাবে জেলা পরিষদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

তবে বাস্তবে শিক্ষার মানোন্নয়ন, অনিয়ম প্রতিরোধ কিংবা শিক্ষক উপস্থিতি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কার্যকর পদক্ষেপ খুব একটা দেখা যায় না।

এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। শিক্ষাবিদ ও সচেতন মহলের মতে, যেসব বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের অনিয়ম ও দায়িত্বহীনতার প্রমাণ পাওয়া যায়, সেসব শিক্ষকের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।

প্রয়োজনে শাস্তিমূলক বদলি করে অন্য জেলায় স্থানান্তরের মতো পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে চলমান “প্রেষণ পদ্ধতি” বাতিলের দাবিও উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।

অভিযোগ রয়েছে, এই পদ্ধতির সুযোগ নিয়ে অনেক শিক্ষক মূল কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকছেন। স্থানীয়দের মতে, পাহাড়ের শিক্ষা ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে হলে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

নিয়মিত তদারকি, শিক্ষকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, প্রত্যন্ত বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ এবং প্রশাসনিক সদিচ্ছার মাধ্যমেই কেবল ফিরতে পারে শিক্ষার সুস্থ পরিবেশ।

অন্যথায় পাহাড়ের হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে বলে আশঙ্কা করছেন অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকরা।