বিদ্যালয়ের অনিয়ম প্রকাশ করায় নারী কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে মারধর ও উচ্ছেদের হুমকি


নিজস্ব প্রতিবেদক    |    ০১:২৫ এএম, ২০২৬-০৫-২৪

বিদ্যালয়ের অনিয়ম প্রকাশ করায় নারী কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে মারধর ও উচ্ছেদের হুমকি

রাঙামাটির দুর্গম সাজেক অঞ্চলে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের অনিয়ম, অব্যবস্থা ও শিক্ষাব্যবস্থার বেহাল চিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরাকে কেন্দ্র করে রিতা চাকমা (ফেসবুক নাম: রি জাং সি চাকমা) নামে এক নারী কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও মারধরের অভিযোগ উঠেছে।

একই সঙ্গে তাকে ও তার পরিবারকে এলাকা থেকে উচ্ছেদের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও প্রতিবাদের সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয় সূত্র এবং রিতা চাকমার প্রকাশিত ভিডিও থেকে জানা যায়, বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নের ছয়নালছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও বিদ্যালয়টির অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি।

এখনো জরাজীর্ণ টিনশেড ভবনে চলছে পাঠদান। দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষক সংকট, দায়িত্বে অবহেলা, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। মাত্র একজন প্রধান শিক্ষক এবং একজন অস্থায়ী ‘বর্গা’ শিক্ষক দিয়ে কোনো রকমে পরিচালিত হচ্ছিল শিক্ষা কার্যক্রম।

এই বাস্তব চিত্র তুলে ধরে সম্প্রতি একটি ভিডিও তৈরি করে নিজের ফেসবুক পেজে প্রকাশ করেন রিতা চাকমা। ভিডিওটি প্রকাশের পর দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ভিডিওটি ৩ লাখ ২৪ হাজারের বেশি মানুষ দেখেছেন, এক হাজারেরও বেশি বার শেয়ার হয়েছে এবং শত শত মানুষ এ নিয়ে মন্তব্য করেছেন।

ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর থেকেই রিতা চাকমার ওপর বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। রিতা চাকমা পরবর্তীতে আরেকটি ভিডিও বার্তায় দাবি করেন, বিদ্যালয়ের অনিয়ম ও বর্গা শিক্ষকের বিষয়টি প্রকাশ্যে আনায় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ক্ষুব্ধ হন।

একপর্যায়ে তাকে ডেকে নিয়ে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও মারধর করা হয়। পাশাপাশি তাকে পরিবারসহ গ্রাম ছাড়ার হুমকিও দেওয়া হয়।

গত ১৬ মে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন রিতা চাকমা। তিনি সাজেক ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব ছয়নালছড়া পাড়ার বাসিন্দা।

রিতা চাকমা বলেন, “ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি দুর্গম এলাকার অনেক সরকারি বিদ্যালয়ে বর্গা শিক্ষক দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো হয়।

দুর্গমতার কারণে উপজেলা প্রশাসন বা শিক্ষা কর্মকর্তারা সবসময় ঠিকমতো তদারকি করতে পারেন না। আমি ভিডিও প্রকাশ করার পর আশপাশের আরও অনেক গ্রাম থেকে একই ধরনের অভিযোগ সামনে আসছে।”

তিনি আরও জানান, বর্তমানে স্থানীয়ভাবে বিষয়টি কিছুটা মীমাংসার চেষ্টা চলছে। তবে তিনি এখনো নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

এ বিষয়ে বাঘাইছড়ি উপজেলা শিক্ষা অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সঞ্চয়ন চাকমা বলেন, সাজেক ইউনিয়নের অনেক বিদ্যালয় অত্যন্ত দুর্গম এলাকায় অবস্থিত। বর্গা শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে আগে কোনো লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ পাওয়া যায়নি।

তিনি আরও জানান, সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ে অনুমোদিত চারজন শিক্ষকের মধ্যে একজন রাঙামাটিতে সংযুক্ত রয়েছেন এবং আরেকজন ২০১৯ সাল থেকে একটি মামলার কারণে সাময়িক বরখাস্ত অবস্থায় আছেন।

বর্তমানে বাকি দুইজন শিক্ষক দিয়ে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

তিনি বলেন, “২০২২ সালের পর থেকে নতুন শিক্ষক নিয়োগ না হওয়ায় পুরো উপজেলাজুড়ে শিক্ষক সংকট দেখা দিয়েছে। এছাড়া যে মেয়েটি অভিযোগ তুলেছে, তার সঙ্গে স্থানীয় কিছু মানুষের ব্যক্তিগত বিরোধ রয়েছে বলেও শুনেছি।”

ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সচেতন মহল বলছে, দুর্গম এলাকার শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তব চিত্র তুলে ধরার কারণে একজন নারী কনটেন্ট ক্রিয়েটরের ওপর হামলা ও হুমকির অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দুর্গম অঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।