রাজস্থলীর বিভিন্ন এলাকায় মাদক পাচারের বিস্তার, ঝুঁকিতে যুব সমাজ


আজগর আলী খান    |    ০২:৪৩ পিএম, ২০২৬-০৬-০১

রাজস্থলীর বিভিন্ন এলাকায় মাদক পাচারের বিস্তার, ঝুঁকিতে যুব সমাজ

রাঙামাটি পার্বত্য জেলার রাজস্থলী উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় তৈরি বাংলা মদ ও গাঁজা পাচারের পাশাপাশি ইয়াবা, হেরোইন এবং বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বিদেশি সিগারেট প্রবেশ ও পাচারের অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

স্থানীয়দের দাবি, সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দিনে-রাতে বিভিন্ন যানবাহনে এসব মাদকদ্রব্য ও অবৈধ পণ্য পার্শ্ববর্তী রাঙ্গুনিয়া, চন্দ্রঘোনা এবং চট্টগ্রাম শহরে পাচার করা হচ্ছে।

এতে উপজেলার উঠতি বয়সী তরুণ সমাজ মাদকের ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সচেতন নাগরিকরা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাজস্থলী উপজেলার পাশ্ববর্তী বান্দরবান সদর এলাকার রাজভিলা, থ্যংখালী, বালুমুড়া, ইসলামপুর, বাঙ্গালহালিয়ার বটতলা, যৌথ খামার, ইসকন মন্দির সংলগ্ন এলাকা এবং রাজস্থলী সীমান্ত সড়কসহ বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসায়ী ও পাচারকারীদের সক্রিয় তৎপরতা চলছে।

অভিযোগ রয়েছে, এসব এলাকা দিয়ে প্রতিনিয়ত গাঁজা, ইয়াবা ট্যাবলেট এবং অন্যান্য মাদকদ্রব্য সরবরাহ ও পাচার করা হচ্ছে।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, রাতের আঁধারে বাঙ্গালহালিয়ার বটতলা হয়ে রাঙ্গুনিয়ার পদুয়া, রাজারহাট ও শিলক-সরফভাটা এলাকায় জিপ ও অন্যান্য যানবাহনের মাধ্যমে দেশীয় তৈরি বাংলা মদ পাচার করা হয়।

একই সঙ্গে ইয়াবা ট্যাবলেটও বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সূত্র জানায়, বাঙ্গালহালিয়া বাজারে প্রতি লিটার দেশীয় তৈরি বাংলা মদ এক হাজার থেকে দুই হাজার টাকায় বিক্রি হলেও পার্শ্ববর্তী উপজেলা এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলে এর দাম আরও বেশি।

ফলে মাদক ব্যবসায়ীরা বিপুল মুনাফার আশায় এ অবৈধ বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়ছে। অভিযোগ রয়েছে, পাচারকারীরা বিভিন্ন সময় স্যালাইনের প্যাকেটে মদ ভরে বস্তাবন্দি করে পরিবহন করে থাকে, যাতে সহজে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে না পড়ে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বাঙ্গালহালিয়া বাজারের বটতলা, পাবনা টিলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকা, শফিপুর, ইসলামপুর, রাজস্থলী শহীদ মিনার এলাকা, সীমান্ত সড়কের তাইতংপাড়া, পাইনছড়া, হাজীপাড়া ব্রিজ, নোয়াপাড়া বটতলাসহ বিভিন্ন স্থানে মাদক ব্যবসায়ী ও পাচারকারীদের তৎপরতা বেড়ে যায়।

তাদের দাবি, বাংলা মদের পাশাপাশি ইয়াবাও গোপনে এলাকায় প্রবেশ করছে এবং একটি সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে বিক্রি হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব খাটিয়ে মাদক ব্যবসা, ইয়াবা কারবার এবং বিদেশি সিগারেট পাচারের সঙ্গে জড়িত।

কেউ কেউ দাবি করেন, বাঙ্গালহালিয়ায় অতীতে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া কয়েকজন ব্যক্তি আবারও মাদক ব্যবসায় সক্রিয় হয়েছেন।

বাঙ্গালহালিয়া ইউনিয়নের কয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তি অভিযোগ করে বলেন, অতীতে মাদক সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত কিছু ব্যক্তি অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন।

তাদের মধ্যে কেউ কেউ বহুতল ভবন, দামি গাড়ি এবং উল্লেখযোগ্য স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মালিক হয়েছেন বলেও স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে রাজস্থলী উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাস্টার খলিলুর রহমান শেখ বলেন, “সমাজে ভালো মানুষের মূল্য দিন দিন কমে যাচ্ছে।

যারা একসময় মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিল, তারাই এখন বিভিন্ন পরিচয় ব্যবহার করে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করছে। এর ফলে যুব সমাজ ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে।”

উপজেলার একজন সিনিয়র রাজনৈতিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পাহাড়ি বাংলা মদ বিভিন্ন যানবাহনে করে পাচার করা হচ্ছে।

একই সঙ্গে ইয়াবা ব্যবসাও গোপনে পরিচালিত হচ্ছে বলে আমরা বিভিন্ন সূত্রে জানতে পারছি। বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।”

অন্যদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত সড়ক, বাঙ্গালহালিয়া পুলিশ ফাঁড়ি এলাকা এবং রাইখালীর কারিগরপাড়া এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক অভিযানে মাদক ও অবৈধ সিগারেট উদ্ধার এবং বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে।

এসব অভিযান স্থানীয়দের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি সৃষ্টি করলেও মাদক কারবার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে চন্দ্রঘোনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাকের বলেন, “বাঙ্গালহালিয়া বাজার ও আশপাশের এলাকায় নিয়মিত পুলিশি টহল অব্যাহত রয়েছে।

মদ বা গাঁজা পাচারের বিষয়ে আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। তবে ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদকের বিষয়ে আমরা নজরদারি রাখছি। কোনো তথ্য পাওয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গে অভিযান পরিচালনা করা হবে।”

তিনি আরও বলেন, “ইতোমধ্যে রাইখালী কারিগরপাড়া ও বড়খোলাপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে দেশীয় তৈরি বাংলা মদসহ কয়েকজন নারী-পুরুষকে আটক করা হয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে।”

স্থানীয় সচেতন নাগরিক, শিক্ষক, অভিভাবক এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে রাজস্থলীর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তারা মাদক পাচার, ইয়াবা ব্যবসা এবং অবৈধ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে কঠোর ও নিয়মিত অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

তাদের মতে, রাজস্থলীকে মাদকমুক্ত রাখতে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ জনগণকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

অন্যথায় সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলে মাদকের বিস্তার আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে, যার চরম মূল্য দিতে হবে আগামী প্রজন্মকে।