প্রটোকল ছাড়াই ভূমি অফিসে প্রতিমন্ত্রীর ঝটিকা অভিযান, উন্মোচিত অনিয়মের ভয়াবহ চিত্র


আলমগীর মানিক    |    ০৮:৩২ পিএম, ২০২৬-০৬-০৮

প্রটোকল ছাড়াই ভূমি অফিসে প্রতিমন্ত্রীর ঝটিকা অভিযান, উন্মোচিত অনিয়মের ভয়াবহ চিত্র

সাভারের আমিনবাজার ও আশুলিয়া রাজস্ব সার্কেল কার্যালয়ে আকস্মিক পরিদর্শন করেছেন ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল।

সোমবার (৮ জুন) কোনো সরকারি প্রটোকল, পুলিশি নিরাপত্তা, সরকারি পতাকাবাহী গাড়ি কিংবা দেহরক্ষী ছাড়াই ব্যক্তিগত গাড়িতে করে তিনি এ পরিদর্শনে যান।

হঠাৎ এই পরিদর্শনে দুই কার্যালয়ের সেবাদান কার্যক্রম, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন অনিয়ম ও ঘাটতি উঠে আসে।

পরিদর্শনের শুরুতে প্রতিমন্ত্রী আমিনবাজার সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে উপস্থিত হন।

সেখানে গিয়ে তিনি দেখতে পান, দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহাদাত হোসাইন খান নির্ধারিত অফিস সময়ে কর্মস্থলে উপস্থিত ছিলেন না।

প্রতিমন্ত্রীর আগমনের প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিনিট পর তিনি কার্যালয়ে পৌঁছান।

একই সঙ্গে কর্মকর্তাদের উপস্থিতির চিত্রও সন্তোষজনক ছিল না। পরিদর্শনকালে দেখা যায়, কার্যালয়ের মোট ৮ জন কর্মকর্তার মধ্যে মাত্র দুইজন, একজন সার্ভেয়ার এবং একজন নামজারি সহকারী, নির্ধারিত সময়ে অফিসে উপস্থিত ছিলেন।

বাকি কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতি নিয়ে প্রতিমন্ত্রী অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

এ সময় ভূমি অফিসে সেবা নিতে আসা কয়েকজন নাগরিক প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন। তারা অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সেবার জন্য ভূমি অফিসে আসা-যাওয়া করলেও নির্ধারিত সময়ে প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছেন না।

অনেক ক্ষেত্রে দিনের পর দিন ঘুরেও কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে না।

সেবাপ্রার্থীদের এসব অভিযোগ শুনে প্রতিমন্ত্রী সেবাদান প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা ও জনভোগান্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

পরে তিনি কার্যালয়ের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতির সময় যাচাই করেন।

পাশাপাশি তথ্য কেন্দ্র-কাম-হেল্প ডেস্কের কার্যক্রম ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা পর্যবেক্ষণ করে এর দুর্বল ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি সংশ্লিষ্টদের আরও দায়িত্বশীল ও সেবামুখী হওয়ার নির্দেশ দেন।

তবে রেকর্ড কিপিং ও ডেটা এন্ট্রি ইউনিট পরিদর্শনকালে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। ওই ইউনিটের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যথাসময়ে উপস্থিত থেকে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

প্রতিমন্ত্রী তাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং চলমান কার্যক্রম সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। এছাড়া তিনি কার্যালয়ের বিভিন্ন রেকর্ড রুম ঘুরে দেখেন এবং নথি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করেন।

পরিদর্শনের সময় কর্মকর্তারা জানান, সার্ভারজনিত জটিলতার কারণে মিউটেশন বা নামজারি কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

এতে সাধারণ মানুষকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে এবং সেবাপ্রদান বিলম্বিত হচ্ছে।

বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে প্রতিমন্ত্রী সার্ভার ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) জারির নির্দেশ দেন।

একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত সমস্যার দ্রুত সমাধান নিশ্চিত করার তাগিদ দেন।

তিনি আরও নির্দেশনা দেন, তথ্যকেন্দ্রকে আলাদা ও নির্দিষ্ট জনবল দিয়ে পরিচালনা করতে হবে, যাতে সেবাপ্রার্থীরা সহজে প্রয়োজনীয় তথ্য ও সহায়তা পেতে পারেন।

তিনি বলেন, শুধু সময় মেনে অফিসে উপস্থিত থাকাই যথেষ্ট নয়, বরং সেবার মান, দক্ষতা এবং কার্যকারিতা নিশ্চিত করাই প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব।

আমিনবাজার কার্যালয় পরিদর্শন শেষে প্রতিমন্ত্রী সাভারের আশুলিয়া রাজস্ব সার্কেল কার্যালয় (পলাশবাড়ী) পরিদর্শনে যান।

সেখানে গিয়ে তিনি কার্যালয়সংলগ্ন এলাকায় লাইসেন্সবিহীন নামজারি কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ এবং বিভিন্ন অবৈধ দোকানপাটের উপস্থিতি দেখতে পান। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর নজরে আনা হয়।

প্রতিমন্ত্রী এ ধরনের অনিয়ম ও অবৈধ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, ভূমি সেবার নামে কোনো ধরনের অননুমোদিত কার্যক্রম কিংবা সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা বরদাশত করা হবে না।

এই আকস্মিক পরিদর্শনের মাধ্যমে আমিনবাজার ও আশুলিয়া উভয় রাজস্ব সার্কেলের সেবাদান ব্যবস্থাপনা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি শৃঙ্খলা, অবকাঠামোগত সক্ষমতা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমের বিভিন্ন দুর্বলতা সামনে আসে।

পরিদর্শন শেষে সংশ্লিষ্টদের অনিয়ম দূর করে জনসেবার মান উন্নয়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল।

তিনি বলেন, ভূমি অফিসকে জনগণের আস্থার প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দক্ষ সেবাদান নিশ্চিত করতে হবে।