কাপ্তাইয়ে কর্মহীন প্রায় ১০ হাজার মানুষ, বিদ্যুৎ-পানির সংকটে বাড়ছে মানবিক বিপর্যয়

পাঁচ দিন ধরে বিদ্যুৎহীন চন্দ্রঘোনা, বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট; ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক    |    ০৬:৪৫ পিএম, ২০২৬-০৭-১১

কাপ্তাইয়ে কর্মহীন প্রায় ১০ হাজার মানুষ, বিদ্যুৎ-পানির সংকটে বাড়ছে মানবিক বিপর্যয়

টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলায় সৃষ্টি হয়েছে বহুমাত্রিক মানবিক সংকট। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা, কৃষিজমি প্লাবিত হওয়া, মাছ ধরা বন্ধ এবং দিনমজুরির কাজ স্থবির হয়ে পড়ায় উপজেলার প্রায় ১০ হাজার মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন বলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে পাঁচ দিন ধরে বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন চন্দ্রঘোনা এলাকায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট। এতে ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, টানা বৃষ্টিতে কাপ্তাই উপজেলার অন্তত ৩২টি স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে পাহাড়ি সড়ক, বসতঘর ও বিভিন্ন অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে ১৮টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হলেও শনিবার পর্যন্ত সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন ৩১৭ জন। তবে অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে এখনও অনীহা প্রকাশ করছে।

কাপ্তাই উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান দিলদার হোসেন বলেন, টানা বর্ষণের কারণে দিনমজুর, কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের কর্মসংস্থান পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। তাঁর ভাষ্য, উপজেলায় প্রায় ১০ হাজার মানুষ বর্তমানে কর্মহীন অবস্থায় রয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য জরুরি ত্রাণ, খাদ্য সহায়তা এবং ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি ও সড়ক মেরামতে সরকারি উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় বড় ধরনের মানবিক সংকট দেখা দিতে পারে।

সীতারঘাট এলাকার বাসিন্দা ডালিম বলেন, সীতারঘাট ও শিলছড়িসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ধসে ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাস্তাঘাট বন্ধ থাকায় মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারছে না। আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটছে এবং দ্রুত সরকারি সহায়তা প্রয়োজন।

চন্দ্রঘোনা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের কলেজ এলাকার বাসিন্দা মরিয়ম বেগম জানান, তাঁদের এলাকায় টানা পাঁচ দিন ধরে বিদ্যুৎ নেই। বিদ্যুৎ না থাকায় মোটর ও গভীর নলকূপ বন্ধ হয়ে পড়েছে। ফলে বিশুদ্ধ পানির মারাত্মক সংকট দেখা দিয়েছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে ছড়া ও বৃষ্টির পানি ব্যবহার করছেন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে।

রাইখালী ইউনিয়নের কৃষক মো. সামশুল আলম বলেন, পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টিতে তাঁর রবি শস্য ও সবজির খেত সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। এসব ফসল বিক্রির টাকায় সারা বছরের সংসার চলত এবং ঋণ পরিশোধ করা হতো। এখন নতুন করে চাষাবাদ শুরু করতেও অন্তত এক মাস সময় লাগবে। এই সময় পরিবার কীভাবে চলবে, সেই দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে বলে জানান তিনি।

ওয়াগ্গা ইউনিয়নের বাসিন্দা ওজিদ কারবাইর জানান, ওয়াগ্গা ছড়ার পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় কুকিমারা, শাক্তাজারী, বড়ইছড়ি বাজার ও রাইখালীসহ বিভিন্ন দুর্গম পাহাড়ি এলাকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। কৃষিজমি, রবি শস্য ও সবজির খেত নষ্ট হয়েছে। নদীতে মাছ ধরাও বন্ধ থাকায় জেলেরা কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। ঘরে খাদ্য ও গবাদিপশুর খাবারের সংকটও দেখা দিয়েছে। তিনি দ্রুত সরকারি ও বেসরকারি সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানান।

চন্দ্রঘোনা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জাকির হোসেন বলেন, মিতিঙ্গাছড়ি, কর্ণফুলী কলেজ এলাকা ও কেপিএমের ফকিরাঘোনাসহ বিভিন্ন পাড়ার পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। পাহাড়ধসে বহু ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় পুরো এলাকা অন্ধকারে রয়েছে এবং বিশুদ্ধ পানির সংকট দিন দিন তীব্র হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত ও কর্মহীন পরিবারগুলোর জন্য জরুরি ভিত্তিতে চাল ও শুকনো খাবার বিতরণের দাবি জানান তিনি।

এদিকে কাপ্তাই উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রায়হানুল ইসলাম জানান, টানা ভারী বর্ষণে উপজেলায় ৩২টি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে এবং এতে চারজন আহত হয়েছেন। বর্তমানে কর্ণফুলী সরকারি ডিগ্রি কলেজে ৭৩ জন, কর্ণফুলী স্টেডিয়ামে ৩০ জন, কাপ্তাই সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৮৪ জন এবং মুরালীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩০ জনসহ মোট ৩১৭ জন চারটি প্রধান আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। উপজেলার মোট ১৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষদের জন্য তিনবেলা খাবার, বিশুদ্ধ পানি এবং চিড়া, মুড়ি, বিস্কুটসহ শুকনো খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। কর্মহীন হয়ে পড়া পরিবারগুলোর মধ্যে সরকারি খাদ্য সহায়তা হিসেবে চাল বিতরণের কার্যক্রমও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে উপজেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিক নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে এবং মাইকিংয়ের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, কৃষক ও ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের অভিন্ন দাবি—দ্রুত ত্রাণ, বিশুদ্ধ পানি, বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনঃস্থাপন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হলে কাপ্তাইয়ে চলমান দুর্যোগ বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।